ঢাকা ০৩:৩৪ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ০৩ নভেম্বর ২০২৬, ১৯ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
[gtranslate]
শিরোনামঃ
ডেঙ্গু রোগীদের সুরক্ষায় চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা হাসপাতালে মশারি দিল জেলা পরিষদ তাহসিফ হত্যা মামলা: দীপকে ফের ৭ দিনের রিমান্ডে চায় পুলিশ শেখ হাসিনা বেঁচে থাকা পর্যন্ত অস্থিতিশীলতার চেষ্টা চলবে: তথ্য উপদেষ্টা ডিসেম্বরের আগেই জাতীয় গ্রিডে রূপপুরের বিদ্যুৎ: বিজ্ঞানমন্ত্রী মজুরি কমিশন গঠন হয়েছে, এখন আন্দোলনের সুযোগ নেই: প্রতিমন্ত্রী টুকু মিরপুরে শ্রমিক আন্দোলনে অরাজকতার চেষ্টা, রাজনৈতিক দলের বিরুদ্ধে অভিযোগ ডিএনসিসি প্রশাসকের শ্রমিক আন্দোলন ঘিরে নারায়ণগঞ্জে ৫ প্লাটুন বিজিবি, সতর্ক বিএনপি নেতাকর্মীরাও মিরপুর-১১-তে শ্রমিক-পুলিশ সংঘর্ষ, যান চলাচল স্বাভাবিক; আটক ৪ এইচএসসিতে শূন্য পাস ২৯৩ প্রতিষ্ঠানে, শাস্তির মুখে শিক্ষক-প্রতিষ্ঠানপ্রধান গোপালগঞ্জে ইয়াবা-গাঁজা ও ১ লাখ ৬৯ হাজার টাকাসহ আটক ১
শাহজালালের

তৃতীয় টার্মিনালে গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিংয়ের দৌড়ে চার আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান

  • অধিকার ডেস্কঃ
  • প্রকাশের সময়ঃ ০৩:১৪:০৮ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ৯ অক্টোবর ২০২৬
  • ১২৯২ Time View

হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনালের গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিংয়ের জন্য চার প্রতিষ্ঠান সংক্ষিপ্ত তালিকায়। সংগৃহীত ছবি

হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল পরিচালনার দায়িত্ব পেতে যাওয়া জাপানি কনসোর্টিয়াম বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) নিরাপত্তা ছাড়পত্রের জন্য চারটি আন্তর্জাতিক গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং প্রতিষ্ঠানের নাম জমা দিয়েছে। এই চার প্রতিষ্ঠানের মধ্য থেকে টার্মিনালটিতে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের পর দ্বিতীয় যাত্রী গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং অপারেটর বেছে নেওয়া হবে।

বেবিচকের সদস্য (অপারেশনস অ্যান্ড প্ল্যানিং) এয়ার কমোডর আবু সাঈদ মাহবুব খান বাসসকে জানান, তালিকায় রয়েছে যুক্তরাজ্যভিত্তিক মেনজিস এভিয়েশন, সুইজারল্যান্ডের সুইসপোর্ট, তুরস্কের সেলেবি এভিয়েশন হোল্ডিং এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতভিত্তিক এমিরেটস গ্রুপের অঙ্গপ্রতিষ্ঠান ডানাটা।

প্রতিষ্ঠানগুলোর কোনো নিরাপত্তা, নিয়ন্ত্রক বা অন্য কোনো উদ্বেগ আছে কি না, যা দেশের প্রধান আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কার্যক্রমে বাধা হতে পারে, তা যাচাই করবে বেবিচক। ছাড়পত্র পাওয়ার পর জাপানি কনসোর্টিয়াম যোগ্য অপারেটরদের মধ্য থেকে একটি প্রতিষ্ঠান নির্বাচন করবে। এরপর নির্বাচিত প্রতিষ্ঠানের নামে প্রয়োজনীয় গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং লাইসেন্স দেবে বেবিচক। এতে তৃতীয় টার্মিনালে প্রস্তুতিমূলক কাজ শুরুর পথ খুলবে।

প্রস্তাবিত কাঠামোয় নির্বাচিত আন্তর্জাতিক অপারেটর যাত্রী গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিংয়ে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের পাশাপাশি কাজ করবে। তবে কার্গো হ্যান্ডলিং একচেটিয়াভাবে জাতীয় পতাকাবাহী সংস্থার হাতেই থাকবে।

গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিংয়ের আওতায় আছে উড়োজাহাজের সেবা কার্যক্রম, ব্যাগেজ ব্যবস্থাপনা, যাত্রী চেক-ইন, র‍্যাম্প পরিচালনা ও টার্ন অ্যারাউন্ড। সেবার মান, সময়ানুবর্তিতা ও যাত্রীর অভিজ্ঞতায় এসবের সরাসরি প্রভাব পড়ে।

শিল্প খাতের বিশ্লেষকদের মতে, এটি শুধু আরেকটি সেবাদাতা নিয়োগ নয়। এর মাধ্যমে টার্মিনাল নির্মাণের ধাপ পেরিয়ে আন্তর্জাতিক মানের পরিচালনার দিকে এগোচ্ছে বাংলাদেশ। যাত্রীদের কাছে সবচেয়ে দৃশ্যমান পরীক্ষা হবে ব্যাগেজ সরবরাহ, চেক-ইনের দক্ষতা, যাত্রী সহায়তা এবং সেবা বিঘ্নিত হলে তা সামলানোর সক্ষমতা। এয়ারলাইনসের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হবে নিরাপদ উড়োজাহাজ পরিচালনা, দ্রুত টার্ন অ্যারাউন্ড, নির্ভরযোগ্য সহায়ক সরঞ্জাম ও ফ্লাইটের সময়সূচি ধরে রাখা।

বাসসের পর্যালোচনা করা শিল্প খাতের তথ্য অনুযায়ী:

মেনজিস ৬৫টি দেশের ৩৪৭টি বিমানবন্দরে কাজ করে। সুইসপোর্ট প্রায় ৪৪ থেকে ৪৯টি দেশের প্রায় ৩১০টি বিমানবন্দরে, ডানাটা ৩৫টি দেশের ১৪৬টি বিমানবন্দর বা স্থানে এবং সেলেবি পাঁচটি দেশের ৬০টিরও বেশি বিমানবন্দরে সেবা দেয়।

কর্মীর সংখ্যায় মেনজিসে ৬৫ হাজারের বেশি, সুইসপোর্টে প্রায় ৪৩ হাজার, ডানাটায় ৫৫ হাজারের বেশি এবং সেলেবিতে প্রায় ৯ হাজার। মেনজিস বছরে প্রায় ৫৩ লাখ ফ্লাইটের গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং করে। সুইসপোর্টের সংখ্যা প্রায় ৪০ লাখ, আর ডানাটা ৮ লাখ ৮৮ হাজারের বেশি উড়োজাহাজের টার্ন অ্যারাউন্ড সামলায়।

কার্গোতে এগিয়ে সুইসপোর্ট, বছরে প্রায় ৬২ লাখ টন। ডানাটার ক্ষেত্রে এ সংখ্যা ৩২ লাখ টন এবং মেনজিসের ২৪ লাখ টন। অর্থাৎ প্রতিষ্ঠানগুলো ভিন্ন ভিন্ন ক্ষেত্রে শক্তিশালী।

বাংলাদেশে মেনজিসের প্রস্তাব বিশেষ নজর কেড়েছে, কারণ এতে স্থানীয় বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান ও দক্ষতা উন্নয়নের বিস্তারিত পরিকল্পনা আছে। নির্বাচিত হলে প্রথম বছরেই ১ কোটি ২০ লাখ মার্কিন ডলারের বেশি বিনিয়োগের প্রস্তাব দিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। এর আওতায় থাকবে গ্রাউন্ড সাপোর্ট সরঞ্জাম, বিমান চলাচল প্রযুক্তি, কর্মী প্রশিক্ষণ ও পরিচালনাগত সক্ষমতা।

পরিকল্পনায় ১ হাজারের বেশি সরাসরি কর্মসংস্থানের কথা বলা হয়েছে, যাতে প্রায় ৯৯ শতাংশ কর্মী বাংলাদেশি হবেন বলে প্রত্যাশা। পরোক্ষভাবে আরও আনুমানিক সাড়ে ৪ হাজার কর্মসংস্থান তৈরি হতে পারে। বিমানবন্দর এলাকায় একটি প্রশিক্ষণ একাডেমি গড়ার প্রস্তাবও আছে। পাশাপাশি পেশাগত প্রশিক্ষণ, ইন্টার্নশিপ ও কর্মজীবনের সুযোগ তৈরিতে দেশের বিশ্ববিদ্যালয় ও বিমান চলাচলবিষয়ক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কাজ করতে চায় তারা।

বেবিচক পরিমাপযোগ্য সেবার মানদণ্ড চালুর দিকে এগোচ্ছে। শিল্প খাতের আলোচনায় প্রথম ব্যাগেজ প্রায় ১৫ মিনিটে এবং সব ব্যাগেজ প্রায় ৪০ মিনিটের মধ্যে সরবরাহের বিষয়টি গুরুত্ব পাচ্ছে।

গত মাসে বাংলাদেশ সফরে মেনজিসের মধ্যপ্রাচ্য, আফ্রিকা ও দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলের নির্বাহী ভাইস প্রেসিডেন্ট চার্লস ওয়াইলি বলেন, ওয়াইড-বডি উড়োজাহাজ থেকে প্রথম ব্যাগেজ ১০ থেকে ১৫ মিনিটে এবং শেষ ব্যাগেজ ৪০ মিনিটের মধ্যে দেওয়ার লক্ষ্য তারা নির্ধারণ করতে পারে। এ জন্য রিয়েল-টাইম স্ক্যানিং, ডিজিটাল ব্যাগেজ সমন্বয় ও কার্যসম্পাদন পর্যবেক্ষণব্যবস্থা ব্যবহার করা হবে বলেও জানান তিনি।

টার্ন অ্যারাউন্ডও গুরুত্বপূর্ণ, কারণ ব্যাগেজ খালাস, সেবা কার্যক্রম বা র‍্যাম্প সমন্বয়ে দেরি হলে দ্রুত এয়ারলাইনসের সময়সূচিতে প্রভাব পড়ে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শাহজালালকে শুধু গন্তব্য বিমানবন্দর থেকে প্রতিযোগিতামূলক আঞ্চলিক হাবে উন্নীত করতে হলে টার্ন অ্যারাউন্ডে ধারাবাহিক দক্ষতা অপরিহার্য।

বেবিচকের সাবেক চেয়ারম্যান এয়ার ভাইস মার্শাল (অব.) মুহাম্মদ মফিদুর রহমান বলেন, টার্মিনালের উন্নত সুবিধার পূর্ণ সুফল পেতে অভিজ্ঞ অপারেটর দরকার। তাঁর মতে, স্থাপিত সরঞ্জাম অত্যাধুনিক, তাই এগুলো চালাতে দক্ষ হাত প্রয়োজন। আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা জ্ঞান বিনিময় এবং দেশের বিমান চলাচল খাতে দক্ষ পেশাজীবী বাড়াতেও সহায়ক হতে পারে। যাত্রী হ্যান্ডলিংয়ে প্রতিযোগিতা চালুর উদ্যোগকে তিনি স্বাগত জানিয়েছেন।

বাংলাদেশে কার্যক্রম চালানো বিদেশি এয়ারলাইনসগুলো বহু বছর ধরে গ্রাউন্ড সেবায় বেশি প্রতিযোগিতার পক্ষে মত দিয়ে আসছে। তাদের যুক্তি, প্রতিযোগিতা সেবার মান বাড়িয়ে ব্যাগেজ সরবরাহ ও টার্ন অ্যারাউন্ডের সময় কমাতে পারে।

বিমান চলাচল খাতের উদ্যোক্তা ও টিএএস এভিয়েশন গ্রুপের চেয়ারম্যান কে এম মজিবুল হক বলেন, আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতাসম্পন্ন অপারেটররা স্থানীয় জনবলকে জ্ঞান হস্তান্তরের পাশাপাশি দক্ষতা, নিরাপত্তা, নিয়ম মানা ও সেবার মান উন্নত করতে পারে। তাঁর মতে, মালিকানা সরকারের হাতে থাকলেও পরিচালনার দায়িত্ব প্রতিষ্ঠিত বৈশ্বিক কোম্পানিকে দেওয়া উচিত।

বিশ্লেষকদের মতে, চারটি প্রতিষ্ঠানেরই উল্লেখযোগ্য যোগ্যতা আছে। সুইসপোর্টের রয়েছে বিশ্বের অন্যতম বড় বিমানবন্দর নেটওয়ার্ক ও কার্গোতে শক্ত অবস্থান। ডানাটা গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিংয়ের সঙ্গে এমিরেটস গ্রুপের বৃহত্তর বিমান চলাচল ব্যবস্থার সমন্বয় ঘটিয়েছে। সেলেবির কয়েক দশকের আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা আছে। আর তুলনামূলক তথ্যে মেনজিসের কার্যক্রম সবচেয়ে বেশি দেশে এবং নেটওয়ার্কও সবচেয়ে বড়।

বিমান চলাচল বিশ্লেষক এ টি এম নজরুল বলেন, যে অপারেটরই নির্বাচিত হোক, তার কাজ মূল্যায়ন করতে হবে ব্যাগেজ সরবরাহ, টার্ন অ্যারাউন্ড, সরঞ্জামের প্রাপ্যতা, নিরাপত্তা, কর্মীদের দক্ষতা ও যাত্রীসেবার মতো সুস্পষ্ট কর্মসম্পাদন সূচকের ভিত্তিতে।

নতুন অপারেটর বিমানের পাশাপাশি কাজ করবে, ফলে একই টার্মিনালে দুই প্রতিষ্ঠানের কার্যসম্পাদন সরাসরি তুলনার সুযোগ তৈরি হবে। বিমান জানিয়েছে, তারা ইতোমধ্যে প্রয়োজনীয় গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং সরঞ্জাম সংগ্রহ করেছে এবং তৃতীয় টার্মিনালের জন্য অতিরিক্ত ১ হাজারের বেশি কর্মী নিয়োগ দিয়েছে।

কনসোর্টিয়ামটি গঠিত হয়েছে জাপান এয়ারপোর্ট টার্মিনাল কোম্পানি লিমিটেড, সুমিতোমো করপোরেশন, নিপ্পন কোই এবং নারিতা ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্ট কর্পোরেশনকে নিয়ে। চুক্তিসংক্রান্ত প্রক্রিয়া শেষ হলে তারা তৃতীয় টার্মিনালের পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব নেবে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, টার্মিনাল পূর্ণাঙ্গভাবে চালুর আগে যাত্রীসেবা দেওয়া গ্রাউন্ড হ্যান্ডলার নিয়োগ হবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরিচালনাগত প্রস্তুতিগুলোর একটি।

জনপ্রিয় সংবাদ

ডেঙ্গু রোগীদের সুরক্ষায় চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা হাসপাতালে মশারি দিল জেলা পরিষদ

শাহজালালের

তৃতীয় টার্মিনালে গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিংয়ের দৌড়ে চার আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান

প্রকাশের সময়ঃ ০৩:১৪:০৮ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ৯ অক্টোবর ২০২৬

হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল পরিচালনার দায়িত্ব পেতে যাওয়া জাপানি কনসোর্টিয়াম বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) নিরাপত্তা ছাড়পত্রের জন্য চারটি আন্তর্জাতিক গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং প্রতিষ্ঠানের নাম জমা দিয়েছে। এই চার প্রতিষ্ঠানের মধ্য থেকে টার্মিনালটিতে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের পর দ্বিতীয় যাত্রী গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং অপারেটর বেছে নেওয়া হবে।

বেবিচকের সদস্য (অপারেশনস অ্যান্ড প্ল্যানিং) এয়ার কমোডর আবু সাঈদ মাহবুব খান বাসসকে জানান, তালিকায় রয়েছে যুক্তরাজ্যভিত্তিক মেনজিস এভিয়েশন, সুইজারল্যান্ডের সুইসপোর্ট, তুরস্কের সেলেবি এভিয়েশন হোল্ডিং এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতভিত্তিক এমিরেটস গ্রুপের অঙ্গপ্রতিষ্ঠান ডানাটা।

প্রতিষ্ঠানগুলোর কোনো নিরাপত্তা, নিয়ন্ত্রক বা অন্য কোনো উদ্বেগ আছে কি না, যা দেশের প্রধান আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কার্যক্রমে বাধা হতে পারে, তা যাচাই করবে বেবিচক। ছাড়পত্র পাওয়ার পর জাপানি কনসোর্টিয়াম যোগ্য অপারেটরদের মধ্য থেকে একটি প্রতিষ্ঠান নির্বাচন করবে। এরপর নির্বাচিত প্রতিষ্ঠানের নামে প্রয়োজনীয় গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং লাইসেন্স দেবে বেবিচক। এতে তৃতীয় টার্মিনালে প্রস্তুতিমূলক কাজ শুরুর পথ খুলবে।

প্রস্তাবিত কাঠামোয় নির্বাচিত আন্তর্জাতিক অপারেটর যাত্রী গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিংয়ে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের পাশাপাশি কাজ করবে। তবে কার্গো হ্যান্ডলিং একচেটিয়াভাবে জাতীয় পতাকাবাহী সংস্থার হাতেই থাকবে।

গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিংয়ের আওতায় আছে উড়োজাহাজের সেবা কার্যক্রম, ব্যাগেজ ব্যবস্থাপনা, যাত্রী চেক-ইন, র‍্যাম্প পরিচালনা ও টার্ন অ্যারাউন্ড। সেবার মান, সময়ানুবর্তিতা ও যাত্রীর অভিজ্ঞতায় এসবের সরাসরি প্রভাব পড়ে।

শিল্প খাতের বিশ্লেষকদের মতে, এটি শুধু আরেকটি সেবাদাতা নিয়োগ নয়। এর মাধ্যমে টার্মিনাল নির্মাণের ধাপ পেরিয়ে আন্তর্জাতিক মানের পরিচালনার দিকে এগোচ্ছে বাংলাদেশ। যাত্রীদের কাছে সবচেয়ে দৃশ্যমান পরীক্ষা হবে ব্যাগেজ সরবরাহ, চেক-ইনের দক্ষতা, যাত্রী সহায়তা এবং সেবা বিঘ্নিত হলে তা সামলানোর সক্ষমতা। এয়ারলাইনসের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হবে নিরাপদ উড়োজাহাজ পরিচালনা, দ্রুত টার্ন অ্যারাউন্ড, নির্ভরযোগ্য সহায়ক সরঞ্জাম ও ফ্লাইটের সময়সূচি ধরে রাখা।

বাসসের পর্যালোচনা করা শিল্প খাতের তথ্য অনুযায়ী:

মেনজিস ৬৫টি দেশের ৩৪৭টি বিমানবন্দরে কাজ করে। সুইসপোর্ট প্রায় ৪৪ থেকে ৪৯টি দেশের প্রায় ৩১০টি বিমানবন্দরে, ডানাটা ৩৫টি দেশের ১৪৬টি বিমানবন্দর বা স্থানে এবং সেলেবি পাঁচটি দেশের ৬০টিরও বেশি বিমানবন্দরে সেবা দেয়।

কর্মীর সংখ্যায় মেনজিসে ৬৫ হাজারের বেশি, সুইসপোর্টে প্রায় ৪৩ হাজার, ডানাটায় ৫৫ হাজারের বেশি এবং সেলেবিতে প্রায় ৯ হাজার। মেনজিস বছরে প্রায় ৫৩ লাখ ফ্লাইটের গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং করে। সুইসপোর্টের সংখ্যা প্রায় ৪০ লাখ, আর ডানাটা ৮ লাখ ৮৮ হাজারের বেশি উড়োজাহাজের টার্ন অ্যারাউন্ড সামলায়।

কার্গোতে এগিয়ে সুইসপোর্ট, বছরে প্রায় ৬২ লাখ টন। ডানাটার ক্ষেত্রে এ সংখ্যা ৩২ লাখ টন এবং মেনজিসের ২৪ লাখ টন। অর্থাৎ প্রতিষ্ঠানগুলো ভিন্ন ভিন্ন ক্ষেত্রে শক্তিশালী।

বাংলাদেশে মেনজিসের প্রস্তাব বিশেষ নজর কেড়েছে, কারণ এতে স্থানীয় বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান ও দক্ষতা উন্নয়নের বিস্তারিত পরিকল্পনা আছে। নির্বাচিত হলে প্রথম বছরেই ১ কোটি ২০ লাখ মার্কিন ডলারের বেশি বিনিয়োগের প্রস্তাব দিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। এর আওতায় থাকবে গ্রাউন্ড সাপোর্ট সরঞ্জাম, বিমান চলাচল প্রযুক্তি, কর্মী প্রশিক্ষণ ও পরিচালনাগত সক্ষমতা।

পরিকল্পনায় ১ হাজারের বেশি সরাসরি কর্মসংস্থানের কথা বলা হয়েছে, যাতে প্রায় ৯৯ শতাংশ কর্মী বাংলাদেশি হবেন বলে প্রত্যাশা। পরোক্ষভাবে আরও আনুমানিক সাড়ে ৪ হাজার কর্মসংস্থান তৈরি হতে পারে। বিমানবন্দর এলাকায় একটি প্রশিক্ষণ একাডেমি গড়ার প্রস্তাবও আছে। পাশাপাশি পেশাগত প্রশিক্ষণ, ইন্টার্নশিপ ও কর্মজীবনের সুযোগ তৈরিতে দেশের বিশ্ববিদ্যালয় ও বিমান চলাচলবিষয়ক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কাজ করতে চায় তারা।

বেবিচক পরিমাপযোগ্য সেবার মানদণ্ড চালুর দিকে এগোচ্ছে। শিল্প খাতের আলোচনায় প্রথম ব্যাগেজ প্রায় ১৫ মিনিটে এবং সব ব্যাগেজ প্রায় ৪০ মিনিটের মধ্যে সরবরাহের বিষয়টি গুরুত্ব পাচ্ছে।

গত মাসে বাংলাদেশ সফরে মেনজিসের মধ্যপ্রাচ্য, আফ্রিকা ও দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলের নির্বাহী ভাইস প্রেসিডেন্ট চার্লস ওয়াইলি বলেন, ওয়াইড-বডি উড়োজাহাজ থেকে প্রথম ব্যাগেজ ১০ থেকে ১৫ মিনিটে এবং শেষ ব্যাগেজ ৪০ মিনিটের মধ্যে দেওয়ার লক্ষ্য তারা নির্ধারণ করতে পারে। এ জন্য রিয়েল-টাইম স্ক্যানিং, ডিজিটাল ব্যাগেজ সমন্বয় ও কার্যসম্পাদন পর্যবেক্ষণব্যবস্থা ব্যবহার করা হবে বলেও জানান তিনি।

টার্ন অ্যারাউন্ডও গুরুত্বপূর্ণ, কারণ ব্যাগেজ খালাস, সেবা কার্যক্রম বা র‍্যাম্প সমন্বয়ে দেরি হলে দ্রুত এয়ারলাইনসের সময়সূচিতে প্রভাব পড়ে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শাহজালালকে শুধু গন্তব্য বিমানবন্দর থেকে প্রতিযোগিতামূলক আঞ্চলিক হাবে উন্নীত করতে হলে টার্ন অ্যারাউন্ডে ধারাবাহিক দক্ষতা অপরিহার্য।

বেবিচকের সাবেক চেয়ারম্যান এয়ার ভাইস মার্শাল (অব.) মুহাম্মদ মফিদুর রহমান বলেন, টার্মিনালের উন্নত সুবিধার পূর্ণ সুফল পেতে অভিজ্ঞ অপারেটর দরকার। তাঁর মতে, স্থাপিত সরঞ্জাম অত্যাধুনিক, তাই এগুলো চালাতে দক্ষ হাত প্রয়োজন। আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা জ্ঞান বিনিময় এবং দেশের বিমান চলাচল খাতে দক্ষ পেশাজীবী বাড়াতেও সহায়ক হতে পারে। যাত্রী হ্যান্ডলিংয়ে প্রতিযোগিতা চালুর উদ্যোগকে তিনি স্বাগত জানিয়েছেন।

বাংলাদেশে কার্যক্রম চালানো বিদেশি এয়ারলাইনসগুলো বহু বছর ধরে গ্রাউন্ড সেবায় বেশি প্রতিযোগিতার পক্ষে মত দিয়ে আসছে। তাদের যুক্তি, প্রতিযোগিতা সেবার মান বাড়িয়ে ব্যাগেজ সরবরাহ ও টার্ন অ্যারাউন্ডের সময় কমাতে পারে।

বিমান চলাচল খাতের উদ্যোক্তা ও টিএএস এভিয়েশন গ্রুপের চেয়ারম্যান কে এম মজিবুল হক বলেন, আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতাসম্পন্ন অপারেটররা স্থানীয় জনবলকে জ্ঞান হস্তান্তরের পাশাপাশি দক্ষতা, নিরাপত্তা, নিয়ম মানা ও সেবার মান উন্নত করতে পারে। তাঁর মতে, মালিকানা সরকারের হাতে থাকলেও পরিচালনার দায়িত্ব প্রতিষ্ঠিত বৈশ্বিক কোম্পানিকে দেওয়া উচিত।

বিশ্লেষকদের মতে, চারটি প্রতিষ্ঠানেরই উল্লেখযোগ্য যোগ্যতা আছে। সুইসপোর্টের রয়েছে বিশ্বের অন্যতম বড় বিমানবন্দর নেটওয়ার্ক ও কার্গোতে শক্ত অবস্থান। ডানাটা গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিংয়ের সঙ্গে এমিরেটস গ্রুপের বৃহত্তর বিমান চলাচল ব্যবস্থার সমন্বয় ঘটিয়েছে। সেলেবির কয়েক দশকের আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা আছে। আর তুলনামূলক তথ্যে মেনজিসের কার্যক্রম সবচেয়ে বেশি দেশে এবং নেটওয়ার্কও সবচেয়ে বড়।

বিমান চলাচল বিশ্লেষক এ টি এম নজরুল বলেন, যে অপারেটরই নির্বাচিত হোক, তার কাজ মূল্যায়ন করতে হবে ব্যাগেজ সরবরাহ, টার্ন অ্যারাউন্ড, সরঞ্জামের প্রাপ্যতা, নিরাপত্তা, কর্মীদের দক্ষতা ও যাত্রীসেবার মতো সুস্পষ্ট কর্মসম্পাদন সূচকের ভিত্তিতে।

নতুন অপারেটর বিমানের পাশাপাশি কাজ করবে, ফলে একই টার্মিনালে দুই প্রতিষ্ঠানের কার্যসম্পাদন সরাসরি তুলনার সুযোগ তৈরি হবে। বিমান জানিয়েছে, তারা ইতোমধ্যে প্রয়োজনীয় গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং সরঞ্জাম সংগ্রহ করেছে এবং তৃতীয় টার্মিনালের জন্য অতিরিক্ত ১ হাজারের বেশি কর্মী নিয়োগ দিয়েছে।

কনসোর্টিয়ামটি গঠিত হয়েছে জাপান এয়ারপোর্ট টার্মিনাল কোম্পানি লিমিটেড, সুমিতোমো করপোরেশন, নিপ্পন কোই এবং নারিতা ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্ট কর্পোরেশনকে নিয়ে। চুক্তিসংক্রান্ত প্রক্রিয়া শেষ হলে তারা তৃতীয় টার্মিনালের পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব নেবে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, টার্মিনাল পূর্ণাঙ্গভাবে চালুর আগে যাত্রীসেবা দেওয়া গ্রাউন্ড হ্যান্ডলার নিয়োগ হবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরিচালনাগত প্রস্তুতিগুলোর একটি।