ঢাকা ০১:৩৫ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ০৩ নভেম্বর ২০২৬, ১৯ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
[gtranslate]
শিরোনামঃ
গোপালগঞ্জে ইয়াবা-গাঁজা ও ১ লাখ ৬৯ হাজার টাকাসহ আটক ১ ডামুড্যায় গৃহবধূকে গলা কেটে হত্যার অভিযোগ, স্বামী আটক হঠাৎ কালকিনি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স পরিদর্শনে স্বাস্থ্যমন্ত্রী গাজীপুরে শ্রমিক বিক্ষোভ নিয়ন্ত্রণে ১১ প্লাটুন বিজিবি মোতায়েন হরমুজ প্রণালিতে ইরানের কেশম দ্বীপে যুক্তরাষ্ট্রের বিমান হামলা মিরপুরে শ্রমিক-পুলিশ সংঘর্ষ, বন্ধ মেট্রোরেলের মিরপুর-১১ স্টেশন গার্মেন্টস শ্রমিকের ছদ্মবেশে নাশকতার অভিযোগে গ্রেপ্তার ৩৩ নগরকান্দায় ব্রিজের সংযোগ সড়ক ধসে মরণফাঁদ, ঝুঁকি নিয়ে চলাচল ইরানযুদ্ধের প্রভাবে চাপে মার্কিন নৌবহর, মেরামতে লাগবে কয়েক বছর ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক উত্তেজনা বাড়ালে পরিণতি ভয়াবহ হবে: রাশিয়ার হুঁশিয়ারি

প্রতিমা বিসর্জন হলেও বিসর্জন না হোক মানবতা

  • অধিকার ডেস্কঃ
  • প্রকাশের সময়ঃ ০১:৫৬:৩৯ অপরাহ্ন, বুধবার, ২১ অক্টোবর ২০২৬
  • ১২৬৪ Time View

সংগৃহীত ছবি

পুরাণ অনুযায়ী দেবী দুর্গার হাতে মহিষাসুরের পরাজয় শুধু এক প্রাচীন দেব-অসুরের যুদ্ধের কাহিনী নয়। যুগে যুগে অন্যায়ের বিরুদ্ধে ন্যায়ের এবং অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে শুভশক্তির চিরন্তন বিজয়ের প্রতীক হিসেবেই একে দেখা হয়। ঢাকের বাদ্য, শঙ্খধ্বনি, আরতির আলো আর ভক্তদের প্রার্থনায় মুখর শারদীয় দুর্গোৎসবের পাঁচ দিনের আনন্দ শেষে আসে বিজয়া দশমী। আজ সেই শুভ বিজয়া দশমী, মা দুর্গাকে বিদায় জানানোর দিন।

আশ্বিন মাসের শুক্লপক্ষের ষষ্ঠীতে সন্তানদের নিয়ে বাপের বাড়িতে আসেন দেবী দুর্গা। দশমীতে তিনি আবার কৈলাসে ফিরে যান। প্রতিমা বিসর্জনের এই মুহূর্তে একদিকে থাকে বিদায়ের গভীর বিষাদ, অন্যদিকে ‘আসছে বছর আবার হবে’ ধ্বনিতে থাকে আগামী আগমনের প্রত্যাশা। তবে আবেগ ও আনুষ্ঠানিকতার বাইরে গিয়ে বিজয়া দশমী আমাদের সামনে আত্মপর্যালোচনা ও আত্মশুদ্ধির একটি বড় সুযোগও এনে দেয়।

পুরাণে অন্যায়ী ও অত্যাচারী অসুরদের বিনাশ করে দেবতাদের রক্ষা করতে দেবী দুর্গার আবির্ভাব ঘটেছিল। কিন্তু বাস্তব সমাজের দিকে তাকালে প্রশ্ন ওঠে, মণ্ডপে অসুরবধের দৃশ্য দেখে আমরা আনন্দ পেলেও দুর্নীতি, নারী নির্যাতন, সামাজিক বৈষম্য, ধর্মীয় বিদ্বেষ ও ক্ষমতার অপব্যবহারের মতো প্রকৃত ‘অসুর’কে কতটা দমন করতে পেরেছি?

সমাজের দুর্বল ও অসহায় মানুষের অধিকার যখন হরণ হয়, কিংবা অন্যায়ের শিকার মানুষ ন্যায়বিচার পেতে হিমশিম খায়, তখন বিজয়ার শিক্ষাকে শুধু উৎসবের গণ্ডিতে আটকে রাখা যায় না। বিজয়ার সার্থকতা তখনই, যখন আমরা ব্যক্তিজীবনে ও সমাজজীবনে সব অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে পারব।

দুর্গাপূজার অন্যতম প্রধান বার্তা নারীর মর্যাদা ও শক্তির আরাধনা। দেবীকে আমরা ‘দশভূজা’ ও সর্বশক্তির রূপে পূজা করি। অথচ বাস্তবে নারী যখন অনাচার, অসম্মান ও অধিকারহীনতার শিকার হন, তখন দেবীবন্দনার সঙ্গে আমাদের সামাজিক আচরণের বৈপরীত্য স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

নারীকে সম্মান করা, তাঁর স্বাধীনতা রক্ষা করা এবং পরিবার ও সমাজে সিদ্ধান্ত গ্রহণের সমান সুযোগ নিশ্চিত করার মধ্য দিয়েই এই শক্তির আরাধনা পূর্ণতা পেতে পারে।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ধর্মীয় সম্প্রীতি ও সর্বজনীন সামাজিক বন্ধন রক্ষা করা বিজয়া দশমীর আরেকটি বড় শিক্ষা। দুর্গোৎসবের আনন্দ হাজার বছর ধরে ধর্ম-বর্ণের সীমানা পেরিয়ে সব মানুষের মিলনমেলায় পরিণত হয়েছে। কিন্তু এই সম্প্রীতি কেবল উৎসবের কয়েক দিনের শুভেচ্ছা বিনিময়ে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। একে অপরের অধিকার স্বীকার করা, বিপদে পাশে দাঁড়ানো এবং ধর্মীয় বা সামাজিক পরিচয়ের কারণে কোনো নাগরিক যেন বৈষম্য বা নিরাপত্তাঝুঁকির মুখে না পড়েন, তা নিশ্চিত করাই হওয়া উচিত আমাদের মূল প্রত্যাশা।

উৎসব শেষে বিসর্জনের সময় নদী ও পরিবেশের ক্ষতি না করার দায়িত্ববোধ যেমন নাগরিক হিসেবে জরুরি, তেমনি জরুরি উৎসবের শিক্ষাকে ধরে রাখা। বিসর্জনের সময় সনাতন বৈদিক মন্ত্র উচ্চারিত হয়-

‘গচ্ছ গচ্ছ পরম স্থানং স্বস্থানম পরমেশ্বরী।
যৎ পূজিতং ময়া দেবী পরিপূর্ণং তদস্তুমে’।

এর অর্থ, হে দেবী পরমেশ্বরী, আপনি পরম ধামে গমন করুন এবং আমাদের পূজা যেন আপনার কৃপায় পূর্ণতা পায়।

লড়াই শেষ হয় না

দেবী দুর্গার মর্ত্য ছেড়ে কৈলাসে গমনের মধ্য দিয়ে শারদীয় দুর্গোৎসবের আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি ঘটে, কিন্তু সমাজের অন্যায়, হিংসা, বৈষম্য ও অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে লড়াই শেষ হয় না। দশমীর প্রতিমা বিসর্জন হোক দেবীকে অশ্রুসিক্ত বিদায় জানানোর আচার। কিন্তু মানুষে মানুষে ভালোবাসা, নারী-পুরুষের সমতা, ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়ানোর সাহস এবং বৈষম্যহীন সমাজ গড়ার প্রত্যয় যেন কোনোভাবেই বিসর্জন না যায়। এটিই হোক বিজয়া দশমীতে আমাদের সবচেয়ে বড় চাওয়া।

জনপ্রিয় সংবাদ

গোপালগঞ্জে ইয়াবা-গাঁজা ও ১ লাখ ৬৯ হাজার টাকাসহ আটক ১

প্রতিমা বিসর্জন হলেও বিসর্জন না হোক মানবতা

প্রকাশের সময়ঃ ০১:৫৬:৩৯ অপরাহ্ন, বুধবার, ২১ অক্টোবর ২০২৬

পুরাণ অনুযায়ী দেবী দুর্গার হাতে মহিষাসুরের পরাজয় শুধু এক প্রাচীন দেব-অসুরের যুদ্ধের কাহিনী নয়। যুগে যুগে অন্যায়ের বিরুদ্ধে ন্যায়ের এবং অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে শুভশক্তির চিরন্তন বিজয়ের প্রতীক হিসেবেই একে দেখা হয়। ঢাকের বাদ্য, শঙ্খধ্বনি, আরতির আলো আর ভক্তদের প্রার্থনায় মুখর শারদীয় দুর্গোৎসবের পাঁচ দিনের আনন্দ শেষে আসে বিজয়া দশমী। আজ সেই শুভ বিজয়া দশমী, মা দুর্গাকে বিদায় জানানোর দিন।

আশ্বিন মাসের শুক্লপক্ষের ষষ্ঠীতে সন্তানদের নিয়ে বাপের বাড়িতে আসেন দেবী দুর্গা। দশমীতে তিনি আবার কৈলাসে ফিরে যান। প্রতিমা বিসর্জনের এই মুহূর্তে একদিকে থাকে বিদায়ের গভীর বিষাদ, অন্যদিকে ‘আসছে বছর আবার হবে’ ধ্বনিতে থাকে আগামী আগমনের প্রত্যাশা। তবে আবেগ ও আনুষ্ঠানিকতার বাইরে গিয়ে বিজয়া দশমী আমাদের সামনে আত্মপর্যালোচনা ও আত্মশুদ্ধির একটি বড় সুযোগও এনে দেয়।

পুরাণে অন্যায়ী ও অত্যাচারী অসুরদের বিনাশ করে দেবতাদের রক্ষা করতে দেবী দুর্গার আবির্ভাব ঘটেছিল। কিন্তু বাস্তব সমাজের দিকে তাকালে প্রশ্ন ওঠে, মণ্ডপে অসুরবধের দৃশ্য দেখে আমরা আনন্দ পেলেও দুর্নীতি, নারী নির্যাতন, সামাজিক বৈষম্য, ধর্মীয় বিদ্বেষ ও ক্ষমতার অপব্যবহারের মতো প্রকৃত ‘অসুর’কে কতটা দমন করতে পেরেছি?

সমাজের দুর্বল ও অসহায় মানুষের অধিকার যখন হরণ হয়, কিংবা অন্যায়ের শিকার মানুষ ন্যায়বিচার পেতে হিমশিম খায়, তখন বিজয়ার শিক্ষাকে শুধু উৎসবের গণ্ডিতে আটকে রাখা যায় না। বিজয়ার সার্থকতা তখনই, যখন আমরা ব্যক্তিজীবনে ও সমাজজীবনে সব অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে পারব।

দুর্গাপূজার অন্যতম প্রধান বার্তা নারীর মর্যাদা ও শক্তির আরাধনা। দেবীকে আমরা ‘দশভূজা’ ও সর্বশক্তির রূপে পূজা করি। অথচ বাস্তবে নারী যখন অনাচার, অসম্মান ও অধিকারহীনতার শিকার হন, তখন দেবীবন্দনার সঙ্গে আমাদের সামাজিক আচরণের বৈপরীত্য স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

নারীকে সম্মান করা, তাঁর স্বাধীনতা রক্ষা করা এবং পরিবার ও সমাজে সিদ্ধান্ত গ্রহণের সমান সুযোগ নিশ্চিত করার মধ্য দিয়েই এই শক্তির আরাধনা পূর্ণতা পেতে পারে।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ধর্মীয় সম্প্রীতি ও সর্বজনীন সামাজিক বন্ধন রক্ষা করা বিজয়া দশমীর আরেকটি বড় শিক্ষা। দুর্গোৎসবের আনন্দ হাজার বছর ধরে ধর্ম-বর্ণের সীমানা পেরিয়ে সব মানুষের মিলনমেলায় পরিণত হয়েছে। কিন্তু এই সম্প্রীতি কেবল উৎসবের কয়েক দিনের শুভেচ্ছা বিনিময়ে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। একে অপরের অধিকার স্বীকার করা, বিপদে পাশে দাঁড়ানো এবং ধর্মীয় বা সামাজিক পরিচয়ের কারণে কোনো নাগরিক যেন বৈষম্য বা নিরাপত্তাঝুঁকির মুখে না পড়েন, তা নিশ্চিত করাই হওয়া উচিত আমাদের মূল প্রত্যাশা।

উৎসব শেষে বিসর্জনের সময় নদী ও পরিবেশের ক্ষতি না করার দায়িত্ববোধ যেমন নাগরিক হিসেবে জরুরি, তেমনি জরুরি উৎসবের শিক্ষাকে ধরে রাখা। বিসর্জনের সময় সনাতন বৈদিক মন্ত্র উচ্চারিত হয়-

‘গচ্ছ গচ্ছ পরম স্থানং স্বস্থানম পরমেশ্বরী।
যৎ পূজিতং ময়া দেবী পরিপূর্ণং তদস্তুমে’।

এর অর্থ, হে দেবী পরমেশ্বরী, আপনি পরম ধামে গমন করুন এবং আমাদের পূজা যেন আপনার কৃপায় পূর্ণতা পায়।

লড়াই শেষ হয় না

দেবী দুর্গার মর্ত্য ছেড়ে কৈলাসে গমনের মধ্য দিয়ে শারদীয় দুর্গোৎসবের আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি ঘটে, কিন্তু সমাজের অন্যায়, হিংসা, বৈষম্য ও অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে লড়াই শেষ হয় না। দশমীর প্রতিমা বিসর্জন হোক দেবীকে অশ্রুসিক্ত বিদায় জানানোর আচার। কিন্তু মানুষে মানুষে ভালোবাসা, নারী-পুরুষের সমতা, ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়ানোর সাহস এবং বৈষম্যহীন সমাজ গড়ার প্রত্যয় যেন কোনোভাবেই বিসর্জন না যায়। এটিই হোক বিজয়া দশমীতে আমাদের সবচেয়ে বড় চাওয়া।