ঢাকা ০৫:৪৭ অপরাহ্ন, বুধবার, ০৫ অগাস্ট ২০২৬, ২১ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
[gtranslate]
শিরোনামঃ
হাম উপসর্গে আরও ৫ শিশুর মৃত্যু ঐক্য ধরে রাখতে না পারলে আবারও ফ্যাসিস্ট শক্তির উত্থান হতে পারে-ইবি উপাচার্য সিঙ্গেল মায়েদের স্বাবলম্বিতা ও বিহারী শিশুদের শিক্ষায় অনন্য সামাজিক উদ্যোগ প্রধানমন্ত্রীর উদ্বোধনে যাত্রা শুরু জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘরের রাজপথের সংঘাতের প্রভাব শুধু সড়কেই সীমাবদ্ধ ছিল না মায়ের উদ্দেশে শেষ চিঠি লিখেই আন্দোলনে যান আনাস জুলাই হত্যাকাণ্ডের দুই বছর: ছয় মামলার রায় মালয়েশিয়ায় তিন বাংলাদেশির মরদেহ উদ্ধার, সহকর্মী বাংলাদেশি গ্রেপ্তার ‘ছাত্রদলের মাস্তানি সহ্য করা হবে না’-সংবাদ সম্মেলনে শিবির সভাপতি নূরুল কলেজে এমপির স্ত্রীর সভাপতি নিয়োগ ৩ মাসের জন্য স্থগিত, হাইকোর্টের রুল

হারিয়ে যাওয়া মৃৎশিল্পের পুনর্জাগরণে বেরোবি শিক্ষার্থীদের ব্যতিক্রমী উদ্যোগ

রংপুরের মুমিনপুর কুমারপাড়ার মৃৎশিল্পীদের সঙ্গে কাজ করছেন বেরোবির শিক্ষার্থীদের গড়ে তোলা ‘কারুকুঞ্জ’ প্ল্যাটফর্মের সদস্যরা।

বাংলার হাজার বছরের ঐতিহ্যের অন্যতম নিদর্শন মৃৎশিল্প। একসময় গ্রামীণ জনপদ, হাট-বাজার, মেলা এবং বিভিন্ন উৎসবের অবিচ্ছেদ্য অংশ ছিল মাটির তৈরি হাঁড়ি-পাতিল, কলস, পুতুল, খেলনা ও নান্দনিক শৌখিন সামগ্রী। কিন্তু আধুনিক প্রযুক্তির প্রসার, প্লাস্টিক ও ফাইবারজাত পণ্যের সহজলভ্যতা এবং ক্রেতাদের পরিবর্তিত চাহিদার কারণে ধীরে ধীরে হারিয়ে যেতে বসেছে এই ঐতিহ্যবাহী শিল্প। ফলে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে মৃৎশিল্পকে জীবিকা হিসেবে বেছে নেওয়া অসংখ্য কারিগর আজ অর্থনৈতিক সংকটের মুখোমুখি।

এই হারিয়ে যেতে বসা শিল্পকে নতুনভাবে মানুষের সামনে তুলে ধরতে এবং মৃৎশিল্পীদের পাশে দাঁড়াতে ব্যতিক্রমী উদ্যোগ নিয়েছেন বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের (বেরোবি) একদল শিক্ষার্থী। তাদের গড়ে তোলা ‘কারুকুঞ্জ’ নামের একটি প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে রংপুর জেলার বদরগঞ্জ উপজেলার ঐতিহ্যবাহী মুমিনপুর কুমারপাড়ার মৃৎশিল্পীদের নিয়ে শুরু হয়েছে দীর্ঘমেয়াদি কাজ।

উদ্যোক্তারা জানান, মৃৎশিল্প কেবল একটি পেশা নয়; এটি বাংলার ইতিহাস, সংস্কৃতি ও লোকজ ঐতিহ্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বাজারে প্লাস্টিক ও অন্যান্য আধুনিক উপকরণের তৈরি পণ্যের আধিপত্য বাড়ায় মাটির তৈরি সামগ্রীর চাহিদা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। এর ফলে অনেক দক্ষ কারিগর বাধ্য হয়ে পূর্বপুরুষের পেশা ছেড়ে অন্য জীবিকার সন্ধান করছেন। এতে শুধু একটি পেশাই নয়, বিলুপ্তির ঝুঁকিতে পড়ছে দেশের সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের একটি মূল্যবান অধ্যায়।

এই বাস্তবতা থেকেই ‘কারুকুঞ্জ’-এর যাত্রা। প্ল্যাটফর্মটির মূল লক্ষ্য হলো স্থানীয় কারিগরদের তৈরি মাটির শিল্পপণ্য সংগ্রহ, আধুনিক উপায়ে প্রচার এবং বৃহত্তর বাজারে পৌঁছে দিয়ে তাদের ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করা। একই সঙ্গে অনলাইন ও অফলাইন উভয় মাধ্যমে দেশব্যাপী এসব পণ্যের পরিচিতি বাড়ানোর পরিকল্পনাও রয়েছে।

উদ্যোক্তারা আরও জানান, শুধু পণ্য বিক্রিই নয়, মৃৎশিল্পীদের জীবনসংগ্রাম, তাদের দক্ষতা, ঐতিহ্য এবং এই শিল্পের ইতিহাস নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরতেও কাজ করছে ‘কারুকুঞ্জ’। তাদের বিশ্বাস, একটি শিল্পকে টিকিয়ে রাখতে হলে শুধু উৎপাদন নয়, মানুষের মধ্যে সেই শিল্পের প্রতি আগ্রহ ও সচেতনতাও তৈরি করতে হবে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের এমন উদ্যোগ স্থানীয় মৃৎশিল্পীদের মধ্যেও নতুন আশার সঞ্চার করেছে। তারা মনে করছেন, শিক্ষিত তরুণদের এই অংশগ্রহণ তাদের পণ্যের নতুন বাজার তৈরি করবে এবং দীর্ঘদিনের অবহেলিত এই শিল্প আবারও মানুষের কাছে গুরুত্ব পাবে।

উদ্যোক্তাদের মতে, সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, সাংস্কৃতিক সংগঠন, ব্যবসায়ী এবং সাধারণ মানুষের সম্মিলিত সহযোগিতা পেলে মুমিনপুর কুমারপাড়ার মৃৎশিল্প আবারও তার হারানো গৌরব ফিরে পেতে পারে। পাশাপাশি দেশের অন্যান্য অঞ্চলের ঐতিহ্যবাহী মৃৎশিল্পও নতুন করে বিকাশের সুযোগ সৃষ্টি হবে।

তারা আরও বলেন, বাংলার সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য সংরক্ষণে স্থানীয় শিল্পীদের পাশে দাঁড়ানো সময়ের দাবি। কারণ একটি ঐতিহ্য হারিয়ে গেলে শুধু একটি শিল্প নয়, হারিয়ে যায় একটি অঞ্চলের ইতিহাস, সংস্কৃতি এবং মানুষের জীবনযাপনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

তরুণদের এই উদ্যোগ ইতোমধ্যেই স্থানীয় পর্যায়ে ইতিবাচক সাড়া ফেলেছে। সংশ্লিষ্টদের আশা, সচেতনতা বৃদ্ধি, বাজার সম্প্রসারণ এবং মানুষের আগ্রহ বাড়ার মাধ্যমে একসময় বিলুপ্তির পথে থাকা বাংলার ঐতিহ্যবাহী মৃৎশিল্প আবারও নতুন প্রাণ ফিরে পাবে।

জনপ্রিয় সংবাদ

হাম উপসর্গে আরও ৫ শিশুর মৃত্যু

হারিয়ে যাওয়া মৃৎশিল্পের পুনর্জাগরণে বেরোবি শিক্ষার্থীদের ব্যতিক্রমী উদ্যোগ

প্রকাশের সময়ঃ ০১:৪৫:৩১ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ৩ অগাস্ট ২০২৬

বাংলার হাজার বছরের ঐতিহ্যের অন্যতম নিদর্শন মৃৎশিল্প। একসময় গ্রামীণ জনপদ, হাট-বাজার, মেলা এবং বিভিন্ন উৎসবের অবিচ্ছেদ্য অংশ ছিল মাটির তৈরি হাঁড়ি-পাতিল, কলস, পুতুল, খেলনা ও নান্দনিক শৌখিন সামগ্রী। কিন্তু আধুনিক প্রযুক্তির প্রসার, প্লাস্টিক ও ফাইবারজাত পণ্যের সহজলভ্যতা এবং ক্রেতাদের পরিবর্তিত চাহিদার কারণে ধীরে ধীরে হারিয়ে যেতে বসেছে এই ঐতিহ্যবাহী শিল্প। ফলে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে মৃৎশিল্পকে জীবিকা হিসেবে বেছে নেওয়া অসংখ্য কারিগর আজ অর্থনৈতিক সংকটের মুখোমুখি।

এই হারিয়ে যেতে বসা শিল্পকে নতুনভাবে মানুষের সামনে তুলে ধরতে এবং মৃৎশিল্পীদের পাশে দাঁড়াতে ব্যতিক্রমী উদ্যোগ নিয়েছেন বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের (বেরোবি) একদল শিক্ষার্থী। তাদের গড়ে তোলা ‘কারুকুঞ্জ’ নামের একটি প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে রংপুর জেলার বদরগঞ্জ উপজেলার ঐতিহ্যবাহী মুমিনপুর কুমারপাড়ার মৃৎশিল্পীদের নিয়ে শুরু হয়েছে দীর্ঘমেয়াদি কাজ।

উদ্যোক্তারা জানান, মৃৎশিল্প কেবল একটি পেশা নয়; এটি বাংলার ইতিহাস, সংস্কৃতি ও লোকজ ঐতিহ্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বাজারে প্লাস্টিক ও অন্যান্য আধুনিক উপকরণের তৈরি পণ্যের আধিপত্য বাড়ায় মাটির তৈরি সামগ্রীর চাহিদা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। এর ফলে অনেক দক্ষ কারিগর বাধ্য হয়ে পূর্বপুরুষের পেশা ছেড়ে অন্য জীবিকার সন্ধান করছেন। এতে শুধু একটি পেশাই নয়, বিলুপ্তির ঝুঁকিতে পড়ছে দেশের সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের একটি মূল্যবান অধ্যায়।

এই বাস্তবতা থেকেই ‘কারুকুঞ্জ’-এর যাত্রা। প্ল্যাটফর্মটির মূল লক্ষ্য হলো স্থানীয় কারিগরদের তৈরি মাটির শিল্পপণ্য সংগ্রহ, আধুনিক উপায়ে প্রচার এবং বৃহত্তর বাজারে পৌঁছে দিয়ে তাদের ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করা। একই সঙ্গে অনলাইন ও অফলাইন উভয় মাধ্যমে দেশব্যাপী এসব পণ্যের পরিচিতি বাড়ানোর পরিকল্পনাও রয়েছে।

উদ্যোক্তারা আরও জানান, শুধু পণ্য বিক্রিই নয়, মৃৎশিল্পীদের জীবনসংগ্রাম, তাদের দক্ষতা, ঐতিহ্য এবং এই শিল্পের ইতিহাস নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরতেও কাজ করছে ‘কারুকুঞ্জ’। তাদের বিশ্বাস, একটি শিল্পকে টিকিয়ে রাখতে হলে শুধু উৎপাদন নয়, মানুষের মধ্যে সেই শিল্পের প্রতি আগ্রহ ও সচেতনতাও তৈরি করতে হবে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের এমন উদ্যোগ স্থানীয় মৃৎশিল্পীদের মধ্যেও নতুন আশার সঞ্চার করেছে। তারা মনে করছেন, শিক্ষিত তরুণদের এই অংশগ্রহণ তাদের পণ্যের নতুন বাজার তৈরি করবে এবং দীর্ঘদিনের অবহেলিত এই শিল্প আবারও মানুষের কাছে গুরুত্ব পাবে।

উদ্যোক্তাদের মতে, সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, সাংস্কৃতিক সংগঠন, ব্যবসায়ী এবং সাধারণ মানুষের সম্মিলিত সহযোগিতা পেলে মুমিনপুর কুমারপাড়ার মৃৎশিল্প আবারও তার হারানো গৌরব ফিরে পেতে পারে। পাশাপাশি দেশের অন্যান্য অঞ্চলের ঐতিহ্যবাহী মৃৎশিল্পও নতুন করে বিকাশের সুযোগ সৃষ্টি হবে।

তারা আরও বলেন, বাংলার সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য সংরক্ষণে স্থানীয় শিল্পীদের পাশে দাঁড়ানো সময়ের দাবি। কারণ একটি ঐতিহ্য হারিয়ে গেলে শুধু একটি শিল্প নয়, হারিয়ে যায় একটি অঞ্চলের ইতিহাস, সংস্কৃতি এবং মানুষের জীবনযাপনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

তরুণদের এই উদ্যোগ ইতোমধ্যেই স্থানীয় পর্যায়ে ইতিবাচক সাড়া ফেলেছে। সংশ্লিষ্টদের আশা, সচেতনতা বৃদ্ধি, বাজার সম্প্রসারণ এবং মানুষের আগ্রহ বাড়ার মাধ্যমে একসময় বিলুপ্তির পথে থাকা বাংলার ঐতিহ্যবাহী মৃৎশিল্প আবারও নতুন প্রাণ ফিরে পাবে।