
খুলনা জেনারেল হাসপাতালে রোগীদের নিম্নমানের খাবার দেখে ক্ষোভে ফেটে পড়লেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন। রোগীদের জন্য রান্না করা কুমড়ার তরকারি মুখে দিয়েই তা সঙ্গে সঙ্গে ফেলে দেন তিনি। পরে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে কড়া ভাষায় প্রশ্ন ছুড়ে দিয়ে বলেন, “এ ধরনের তরকারি আপনাদের বাসায় রান্না হলে কি খেতেন?”
বুধবার সকাল সাড়ে ১০টার দিকে আকস্মিকভাবে খুলনা জেনারেল হাসপাতাল (সদর হাসপাতাল) পরিদর্শনে যান স্বাস্থ্যমন্ত্রী। তার সফর ঘিরে হাসপাতালজুড়ে তৈরি হয় তীব্র চাঞ্চল্য। ওয়ার্ড, বহির্বিভাগ, শৌচাগার, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা থেকে শুরু করে রান্নাঘর— সবখানেই ঘুরে দেখেন তিনি। কথা বলেন রোগী ও স্বজনদের সঙ্গে। তবে সবচেয়ে বেশি ক্ষুব্ধ হন রোগীদের খাবারের মান দেখে।
হাসপাতালের রান্নাঘরে গিয়ে রোগীদের জন্য প্রস্তুত করা তরকারি পরীক্ষা করতে গিয়ে কার্যত বিস্ফোরিত হন মন্ত্রী। কুমড়ার তরকারি মুখে দেওয়ার পরই তা ফেলে দিয়ে সংশ্লিষ্টদের উদ্দেশে বলেন, “রোগীদের সঙ্গে এমন আচরণ কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না।” এ সময় তিনি বাবুর্চিকে ডেকে খাবারের মান উন্নত করার নির্দেশ দেন এবং হাসপাতাল পরিচালকের ভূমিকাও প্রশ্নবিদ্ধ করেন।
পরিদর্শনকালে হাসপাতালের বিভিন্ন অনিয়ম নিয়েও অসন্তোষ প্রকাশ করেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী। তিনি বলেন, “হাসপাতালে রোগীর চাপ বেশি থাকায় কিছু সীমাবদ্ধতা থাকতে পারে, কিন্তু কিছু অনিয়ম কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। জনগণের চিকিৎসাসেবা নিয়ে অবহেলা বরদাশত করা হবে না।”
সম্প্রতি আলোচিত অ্যান্টি-র্যাবিস ভ্যাকসিন সংকট প্রসঙ্গেও কথা বলেন তিনি। মন্ত্রী জানান, “এ ধরনের পরিস্থিতি হওয়ার কথা ছিল না। বিষয়টি আরও খতিয়ে দেখা হবে।”
তবে ওয়ার্ডে থাকা রোগীদের কাছ থেকে চিকিৎসাসেবা নিয়ে ইতিবাচক মন্তব্যও পেয়েছেন বলে জানান তিনি। স্বাস্থ্যমন্ত্রীর ভাষায়, “রোগীরা বলেছে তারা সেবা পাচ্ছে। কিন্তু সার্বিক ব্যবস্থাপনায় আরও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে।”
দেশের স্বাস্থ্যখাত নিয়ে দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনার কথাও তুলে ধরেন তিনি। সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, “গত ১৭ বছরে স্বাস্থ্যখাতে তেমন কিছু কেনা হয়নি, শুধু লুটপাট হয়েছে। ফ্যাসিস্ট সরকার ও তত্ত্বাবধায়ক সরকারও এই খাতকে অবহেলা করেছে।”
তিনি জানান, আগামী বাজেটে স্বাস্থ্যখাতে অতিরিক্ত ১ শতাংশ বরাদ্দ বাড়ানোর প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। বাজেট পাস হলে ধাপে ধাপে দেশের হাসপাতালগুলোতে আধুনিক চিকিৎসা সরঞ্জাম সরবরাহ করা হবে। “জনগণকে আধুনিক চিকিৎসাসেবা দিতে আমরা হাসপাতালগুলোকে নতুনভাবে সাজাতে চাই,” বলেন তিনি।
খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে সাম্প্রতিক অগ্নিকাণ্ডে ক্ষতিগ্রস্ত ভবনও পরিদর্শন করেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী। তিনি দ্রুত অপারেশন থিয়েটার চালুর নির্দেশ দেন এবং ঘটনার তদন্তে পাঁচ সদস্যের কমিটি গঠনের কথা জানান।
এ সময় তিনি আরও ঘোষণা দেন, আগামী পাঁচ মাসের মধ্যে খুলনাসহ দেশের পাঁচ বিভাগীয় শহরে নির্মাণাধীন অত্যাধুনিক পাঁচটি শিশু হাসপাতাল চালু করা হবে। তার দাবি, এতে দেশের শিশুস্বাস্থ্যসেবায় “নতুন দিগন্ত” উন্মোচিত হবে।
স্বাস্থ্যমন্ত্রীর এই আকস্মিক পরিদর্শনের পর হাসপাতালজুড়ে শুরু হয়েছে তোলপাড়। রোগীদের খাবারের মান, পরিচ্ছন্নতা ও সেবার দুরবস্থা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। অনেকেই বলছেন, মন্ত্রীর সামনে যে চিত্র ধরা পড়েছে, সেটি দেশের সরকারি হাসপাতালগুলোর দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনারই নগ্ন প্রতিচ্ছবি।
পরিদর্শনের সময় খুলনা সিটি করপোরেশনের প্রশাসক নজরুল ইসলাম মঞ্জু, জেলা প্রশাসক হুরে জান্নাত, খুলনার সিভিল সার্জন মোছা. মাহফুজা খাতুনসহ স্বাস্থ্য বিভাগের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
দৈনিক অধিকার ডেস্ক 
























