
শুক্রবার (৩১ জুলাই) রাত সাড়ে ১০টা। খুলনা মহানগরীর শহীদ হাদিস পার্ক সংলগ্ন যশোর রোডের একটি ভাড়া বাসায় নেমে এসেছে শোকের ভারী নীরবতা। ঘরের ভেতরে স্বজনদের চাপা কান্না, আর এক অসহায় মাকে সান্ত্বনা দেওয়ার ব্যর্থ চেষ্টা।
দরজায় কড়া নাড়তেই ভেতর থেকে এগিয়ে এলেন এক মা। চোখভরা উৎকণ্ঠা নিয়ে তিনি শুধু একটি প্রশ্ন করলেন—”আপনারা কারা? আমার অক্ষর কোথায়?”
এই প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার ভাষা তখন কারও ছিল না।কারণ, যার জন্য অপেক্ষা—সেই অক্ষর সৌভিক রায় আর কোনোদিন ফিরবেন না।
শুক্রবার দুপুরে কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতে প্যারাসেইলিং করার সময় দুর্ঘটনায় সমুদ্রে পড়ে প্রাণ হারান তিনি। ঢাকার একটি ভিসা এজেন্সিতে কর্মরত অক্ষর অফিসের সহকর্মীদের সঙ্গে আনন্দভ্রমণে গিয়েছিলেন। যে সফর আনন্দের স্মৃতি হয়ে থাকার কথা ছিল, সেটিই মুহূর্তেই পরিণত হলো একটি পরিবারের সারাজীবনের শোকে।
পরিবারের সদস্যরা জানান, মৃত্যুর খবর রাত পর্যন্ত পুরোপুরি জানানো হয়নি অক্ষরের মা শুক্লা রায়কে। কিন্তু একজন মায়ের হৃদয় যেন আগেই সব বুঝে গিয়েছিল। বারবার অজ্ঞান হয়ে পড়ছিলেন তিনি। জ্ঞান ফিরলেই কাঁদতে কাঁদতে বলছিলেন—
“অক্ষর ফোন করে বলেছিল, ‘মা, আমি একটু সমুদ্রে যাব।’ আমি বলেছিলাম, যাস না। ও বলল, ‘না মা, আমি যাব। আমার কিছু হবে না। আমি যাব, আর আসব।'”
সেই “আসব” আর কোনোদিন সত্যি হলো না।
করোনা মহামারির সময় বাবা শেখর রায়কে হারানোর পর পরিবারের পুরো দায়িত্ব প্রায় একাই কাঁধে তুলে নিয়েছিলেন অক্ষর। বৃদ্ধ মা ও ছোট বোন শীর্ষা রায়কে নিয়ে ছিল তাদের ছোট্ট সংসার। শীর্ষা পড়াশোনার পাশাপাশি টিউশনি করতেন, আর অক্ষর ঢাকায় চাকরি করে সংসারের সব দায়িত্ব পালন করতেন। একমাত্র উপার্জনক্ষম ছেলেকে হারিয়ে মুহূর্তেই ভেঙে পড়েছে পরিবারটি।
অক্ষরের এক মাসি, যিনি নাম প্রকাশ করতে চাননি, কান্নাজড়িত কণ্ঠে জানান, বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে দুর্ঘটনার খবর পান। পরে কক্সবাজার থেকে পাঠানো ভিডিও দেখে নিশ্চিত হন, সেটিই অক্ষরের মরদেহ।
কথা বলতে বলতে তিনি স্মৃতিচারণ করে বলেন, “তিন বছর বয়সে আমি নিজ হাতে ওকে সাজিয়ে স্টুডিওতে নিয়ে ছবি তুলেছিলাম। তখন কি জানতাম, একদিন সেই ছবিটাই আমাদের সবচেয়ে বড় স্মৃতি হয়ে থাকবে?”
পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, অক্ষরের শিক্ষাজীবনের শুরু খুলনার জোহরা খাতুন বিদ্যা নিকেতনে। পরে তিনি খুলনা জিলা স্কুল, ঢাকার নটরডেম কলেজে পড়াশোনা করেন। উচ্চশিক্ষার জন্য ভারতের গুজরাটে গিয়ে প্রকৌশল বিষয়ে পড়াশোনা শেষ করে দেশে ফিরে একটি ভিসা এজেন্সিতে চাকরি নেন। কর্মজীবনের ব্যস্ততার ফাঁকে সহকর্মীদের সঙ্গে সেই ভ্রমণই হয়ে উঠল তার জীবনের শেষ সফর।
প্রতিবেশী শেখর সাহানি মনি বলেন, “ছোটবেলা থেকে অক্ষরকে বড় হতে দেখেছি। পরিবারের সঙ্গে আমাদের আত্মীয়তার মতো সম্পর্ক ছিল। এমন মৃত্যু কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না।”
তিনি আরও বলেন, “ঘটনাটি কীভাবে ঘটল, সেটি সুষ্ঠুভাবে তদন্ত হওয়া দরকার।”
পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, অক্ষরের বড় চাচা শংকর রায়সহ কয়েকজন আত্মীয় রাতেই কক্সবাজারের উদ্দেশ্যে রওনা দিয়েছেন। খুলনার বাসায় থাকা স্বজনরা শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত মায়ের কাছ থেকে মৃত্যুসংবাদ গোপন রাখার চেষ্টা করছিলেন।
কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মো. আ. মান্নান জানান, পরিবারের সদস্যদের বিষয়টি জানানো হয়েছে। তারা কক্সবাজারে পৌঁছানোর পর রবিবার (২ আগস্ট) ময়নাতদন্ত শেষে মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হতে পারে।
এদিকে খুলনার সেই ছোট্ট ভাড়া বাসায় এখনো যেন সময় থমকে আছে। দরজার দিকে তাকিয়ে আছেন এক মা। হয়তো এখনো বিশ্বাস করতে চান, দরজায় কড়া নাড়লেই ছেলে ফিরে এসে বলবে—
“মা, আমি এসে গেছি।”
কিন্তু বাস্তবতা নির্মম। তাই রাত যত গভীর হচ্ছে, ততই ঘরের নীরবতা ভেঙে বারবার ভেসে আসছে এক মায়ের আর্তনাদ—“আমার অক্ষর কোথায়?”
দৈনিক অধিকার ডেস্কঃ 
























