
ময়মনসিংহের ভালুকা উপজেলার গোয়ারী গ্রামের পথ ধরে এগোতেই চোখে পড়ে সারি সারি সবুজ গাছ। কোথাও ঝুলছে লাল রঙের কাঁটাওয়ালা রাম্বুটানের থোকা, কোথাও আবার সোনালি-বাদামি রঙের লংগান বা কাঠলিচু। দেখতে অনেকটা লিচুর মতো হলেও স্বাদে ভিন্ন এই বিদেশি ফল দুটি এখন শুধু বাগানের সৌন্দর্যই বাড়াচ্ছে না, বদলে দিচ্ছে দুই উদ্যোক্তার ভাগ্যও।
কয়েক বছর আগেও এই জমিতে ছিল দেশীয় ফলের বাগান। আম, পেয়ারা কিংবা বরই চাষ করেও কাঙ্ক্ষিত লাভের মুখ দেখেননি উদ্যোক্তা শেখ মামুন ও আশরাফ শুভ। উৎপাদন খরচ মেটাতেই হিমশিম খেতে হয়েছিল তাদের। সেই অভিজ্ঞতা থেকেই খোঁজেন নতুন পথ। ২০২০ সালের শেষদিকে থাইল্যান্ড থেকে রাম্বুটান ও লংগানের চারা এনে শুরু করেন পরীক্ষামূলক চাষ, যা এখন পরিণত হয়েছে সফলতার গল্পে।
প্রায় ২০ বিঘা জমির বাগানে বর্তমানে রয়েছে ৩৫০টি পরিণত রাম্বুটান গাছ। পাশাপাশি বিভিন্ন জাতের লংগান, থাই কাটি মন, পেঁপেসহ দেশি-বিদেশি নানা ফলের সমাহার রয়েছে সেখানে। প্রতিদিনই দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে মানুষ আসছেন বাগান দেখতে, ফল কিনতে কিংবা চারা সংগ্রহ করতে।
বাগানের উদ্যোক্তা শেখ মামুন জানান, এবার ফলন আরও বেশি হওয়ার প্রত্যাশা ছিল। তবে ফুল আসার সময় টানা বৃষ্টির কারণে অনেক গাছে ফুলের পরিবর্তে নতুন পাতা গজিয়ে যায়। এরপরও ফলন সন্তোষজনক হয়েছে বলে জানান তিনি। গত বছর প্রায় ৫৫ থেকে ৬০ লাখ টাকার রাম্বুটান বিক্রি হয়েছিল, এবার সেই আয় ৭০ থেকে ৮০ লাখ টাকায় পৌঁছাবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি।
তিনি আরও বলেন, এই চাষের সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো আলাদাভাবে বাজার খোঁজার প্রয়োজন হয় না। ফল পাকতে শুরু করলেই দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে পাইকার ও খুচরা ক্রেতারা সরাসরি বাগানে চলে আসেন। বর্তমানে প্রতি কেজি রাম্বুটান বিক্রি হচ্ছে প্রায় দেড় হাজার টাকা দরে।
এবারের আরেক আকর্ষণ লংগান। বাগানের একাংশজুড়ে রয়েছে ফোর সিজন, কোহালা, রুবি, হোয়াইট, পিংপং ও ডায়মন্ড রিভারসহ বিভিন্ন জাতের লংগান। বাংলাদেশের আবহাওয়ায় কোন জাত সবচেয়ে ভালো ফলন দেয় এবং কোনটির স্বাদ ও শাঁস তুলনামূলক ভালো—এসব নিয়ে কয়েক বছর ধরে গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছেন উদ্যোক্তারা।

আরেক উদ্যোক্তা আশরাফ শুভ বলেন, তাদের লক্ষ্য শুধু ফল বিক্রি নয়, বরং বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে উপযোগী লংগান বা কাঠলিচুর জাত নির্বাচন করা। এবার প্রতি কেজি লংগান বিক্রি হয়েছে ৪০০ টাকা দরে এবং দেশের বিভিন্ন ফলের আড়ত ও সুপারশপের প্রতিনিধিরা সরাসরি বাগান থেকে ফল সংগ্রহ করেছেন। রসিকতার সুরে তিনি জানান, লংগানের সবচেয়ে বড় প্রতিদ্বন্দ্বী মানুষ নয়, বরং পাখি। ফল পাকা শুরু হলেই পাখিরা ভিড় জমায়, তবু গাছে জাল না দিয়ে পাখিদের জন্যও কিছু ফল রেখে দেওয়ার কথা জানান তিনি।
বাগানটি এখন শুধু ফল উৎপাদনের স্থান নয়, রীতিমতো কৃষি পর্যটনের কেন্দ্রেও পরিণত হয়েছে। ইউটিউব ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভিডিও দেখে প্রতিদিনই দর্শনার্থীরা ছুটে আসছেন এখানে।
গাজীপুরের বোর্ড বাজার থেকে আসা দর্শনার্থী সুমন চন্দ্র রায় জানান, বিদেশি ফল বাংলাদেশের মাটিতে এতটা সুন্দরভাবে ফলতে পারে তা আগে বিশ্বাস করতেন না তিনি। নিজের চোখে দেখে মুগ্ধ হয়ে ফল কেনার পাশাপাশি ভবিষ্যতে নিজেও এমন একটি বাগান গড়ার পরিকল্পনার কথা জানান তিনি। একই অভিজ্ঞতার কথা জানান মুক্তাগাছা থেকে আসা শরিফুল ইসলামও। দীর্ঘদিন ইউটিউবে বাগানটি দেখার পর সরাসরি ঘুরতে আসেন তিনি এবং ফলের পাশাপাশি চারা সংগ্রহ করে নিজের বাড়িতেও বিদেশি ফলের বাগান গড়ে তোলার ইচ্ছা প্রকাশ করেন।
এ বিষয়ে ভালুকা উপজেলা কৃষি বিভাগের উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা নূর জাহান বলেন, বিদেশি ফল হলেও রাম্বুটান ও লংগান বাংলাদেশের আবহাওয়ায় বেশ ভালোভাবে মানিয়ে নিয়েছে। তার ভাষ্যমতে, রাম্বুটান একটি উচ্চমূল্যের ফল এবং স্বাদ ও সৌন্দর্যের কারণে এর প্রতি মানুষের আগ্রহ দ্রুত বাড়ছে। দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে মানুষ বাগান পরিদর্শনে আসছেন, চারা সংগ্রহ করছেন এবং নতুন বাগান গড়ার বিষয়ে পরামর্শ নিচ্ছেন।
তিনি আরও জানান, রাম্বুটানে রয়েছে প্রচুর ভিটামিন সি ও অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট এবং মোটা খোসার কারণে এটি তুলনামূলক দীর্ঘদিন সংরক্ষণ করা সম্ভব। অন্যদিকে লংগান গাছও কম পরিচর্যায় ভালো ফলন দেয় বলে জানান তিনি, ফলে বাণিজ্যিকভাবে এই দুই ফলের চাষের সম্ভাবনা যথেষ্ট উজ্জ্বল বলে মনে করেন তিনি।
ভালুকার এই বাগান যেন একটি বার্তাই দিচ্ছে—সঠিক পরিকল্পনা, ধৈর্য আর নতুন কিছু করার সাহস থাকলে বাংলাদেশের মাটিতেও বিদেশি ফলের সফল চাষ সম্ভব। আর সেই সম্ভাবনার গল্পই এখন ছড়িয়ে পড়ছে দেশের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে।
শফিয়েল আলম সুমন, ময়মনসিংহ প্রতিনিধিঃ 

























