
সারাদেশে চলমান মাদকবিরোধী বিশেষ অভিযানের মধ্যে রাজশাহীর সীমান্তবর্তী গোদাগাড়ী উপজেলায় ফের আলোচনায় এসেছে কথিত মাদক কারবার, অবৈধ সম্পদ অর্জন এবং প্রভাবশালী চক্রের বিষয়টি। নিয়মিত অভিযানে মাদক উদ্ধার ও গ্রেপ্তার অব্যাহত থাকলেও অভিযোগ রয়েছে, বড় পর্যায়ের বেশ কয়েকজন কারবারি দীর্ঘদিন ধরে আইনের নাগালের বাইরে থেকে যাচ্ছেন।
সম্প্রতি গোদাগাড়ী উপজেলা পরিষদ মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত এক কমিউনিটি পুলিশিং সভায় মাদক সংশ্লিষ্ট অভিযোগে আলোচিত কয়েকজনের উপস্থিতি প্রকাশ্যে আসার পর প্রশাসনিক মহলে ব্যাপক আলোচনার সৃষ্টি হয়। বিষয়টি গণমাধ্যমে উঠে আসার পর রাজশাহী রেঞ্জের পুলিশের উপমহাপরিদর্শক (ডিআইজি) মোহাম্মদ শাহজাহান কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশনা দেওয়ার কথা জানান।
এই প্রেক্ষাপটে নতুন করে আলোচনায় এসেছে গোদাগাড়ী উপজেলার মাটিকাটা ইউনিয়নের মাটিকাটা ভাটা গ্রামের বাসিন্দা শাহীন আলীর নাম। স্থানীয় সূত্র বলছে, বর্তমানে তিনি মাটিকাটা ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ড যুবদলের সভাপতির দায়িত্বে আছেন।
সংশ্লিষ্ট নথিপত্র অনুযায়ী, শাহীন আলীর বিরুদ্ধে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে বিভিন্ন থানায় অন্তত চারটি মামলা বিদ্যমান। এর মধ্যে রয়েছে গোদাগাড়ী থানায় দায়ের হওয়া মামলা (নং-২৬, তারিখ ১০ আগস্ট ২০২১) এবং পার্বতীপুর রেলওয়ে থানায় দায়ের হওয়া তিনটি পৃথক মামলা— যথাক্রমে ১৯ মার্চ ২০২২ (দায়রা নং-৬১৫/২৩), ১৫ এপ্রিল ২০২২ (দায়রা নং-৫৬৬/২৩) এবং ৪ জুলাই ২০২২ (দায়রা নং-৩৯৫/২৩) তারিখে দায়ের করা মামলাগুলো।
সূত্র জানায়, এসব মামলার মধ্যে অন্তত দুইটিতে তাকে কারাভোগ করতে হয়েছে— একবার দিনাজপুর কারাগারে এবং আরেকবার রাজশাহী কেন্দ্রীয় কারাগারে।
স্থানীয়দের ভাষ্যমতে, প্রায় ১৫ বছর আগে শাহীন আলী তার বাবার সঙ্গে গবাদিপশুর চিকিৎসা তথা কবিরাজি পেশায় যুক্ত ছিলেন এবং একইসঙ্গে সীমান্ত এলাকায় গরু পরিবহন ও রাখালির কাজও করতেন। তবে স্থানীয়দের দাবি, পরবর্তী সময়ে তিনি মাদক ব্যবসায় জড়িয়ে পড়েন এবং অল্প সময়ের মধ্যেই বিপুল পরিমাণ সম্পদের মালিক হয়ে ওঠেন।
স্থানীয় অনুসন্ধানে জানা যায়, নিজ গ্রামে তিনি কোটি টাকা খরচ করে একটি দোতলা বাড়ি নির্মাণ করেছেন এবং সেই সঙ্গে গড়ে তুলেছেন দুটি গরুর খামার। এছাড়া তার মালিকানায় রয়েছে দুটি ট্রাক্টর, দুটি ১০ চাকার ট্রাক, একটি নোহা মাইক্রোবাস এবং একটি শস্য মাড়াইয়ের যন্ত্র বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন।
রাজশাহী মহানগরীর ডাবতলা এলাকায় প্রায় ১০ কাঠা জমির ওপর বাড়ি নির্মাণসহ শহরের আরও কয়েকটি স্থানে জমি কেনার তথ্যও পাওয়া গেছে স্থানীয়দের কাছ থেকে। পাশাপাশি প্রায় ৪০ থেকে ৫০ বিঘা কৃষিজমির মালিকানার অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
কয়েকজন স্থানীয় বাসিন্দার অভিযোগ, মাদক ব্যবসা থেকে উপার্জিত অর্থের একাংশ হুন্ডির মাধ্যমে লেনদেন হয় এবং এমন একটি নেটওয়ার্কের সঙ্গেও শাহীন আলীর সংশ্লিষ্টতা থাকার অভিযোগ রয়েছে। তবে এ পর্যন্ত এ বিষয়ে কোনো সরকারি তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়নি।
এসব অভিযোগ সম্পর্কে প্রতিক্রিয়া জানতে শাহীন আলীর ব্যবহৃত মুঠোফোন নম্বরে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও নম্বরটি বন্ধ পাওয়া যায়, ফলে তার বক্তব্য নেওয়া যায়নি।
এ প্রসঙ্গে গোদাগাড়ী মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আতিকুর রহমান জানান, মাদকবিরোধী অভিযান চলমান রয়েছে এবং ডিবি, পুলিশ, র্যাব ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর একযোগে কাজ করছে। বড় পর্যায়ের অভিযুক্তদের বিরুদ্ধেও প্রয়োজনীয় আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে তিনি জানান।
রাজশাহী জেলা মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মেহেদী হাসান বলেন, মাদক কারবারিদের নতুন তালিকা তৈরি করা হচ্ছে এবং সেই তালিকায় শাহীনের নামও রয়েছে। অভিযানের পাশাপাশি অবৈধভাবে অর্জিত সম্পদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে বলে জানান তিনি। ইতিমধ্যে গোদাগাড়ীর আব্দুল্লাহ ও তারেক নামের দুই ব্যক্তির সম্পত্তি ক্রোক করার তথ্যও দেন তিনি।
রাজশাহী রেঞ্জের ডিআইজি মোহাম্মদ শাহজাহান বলেন, মাদকের সঙ্গে সম্পৃক্ত যে কেউ হোক না কেন— ক্রেতা, বিক্রেতা বা সেবনকারী— তাদের বিরুদ্ধে শূন্য সহনশীলতা নীতি অনুসরণ করা হচ্ছে। মাদক ব্যবসায়ীদের তথ্য সংগ্রহ করে আইনের আওতায় আনার কাজ চলছে বলে জানান তিনি।
সংশ্লিষ্টদের মতে, চলমান মাদকবিরোধী অভিযানের প্রকৃত সাফল্য নির্ভর করবে খুচরা পর্যায়ের কারবারি নয়, বরং অভিযোগের মুখে থাকা বড় নেটওয়ার্ক এবং তাদের সম্পদের উৎস অনুসন্ধান করে আইনের আওতায় আনার ওপর।
সৈয়দ মাসুদ, রাজশাহী 























