
কালো মেঘে ঢেকে গিয়েছিল আকাশ। শুরু হয়েছিল ঝুম বৃষ্টি। কেউ আমবাগানে আম কুড়াচ্ছিলেন, কেউ মাঠ থেকে গবাদিপশু আনতে গিয়েছিলেন, আবার কেউ ঘাস কেটে বাড়ি ফিরছিলেন। কিন্তু মুহূর্তের মধ্যে প্রকৃতির ভয়াল রূপ কেড়ে নিল ছয়টি তাজা প্রাণ। চাঁপাইনবাবগঞ্জের তিন উপজেলায় বৃহস্পতিবার বিকেলে পৃথক বজ্রপাতের ঘটনায় তিন নারীসহ ছয়জনের মৃত্যু হয়েছে।
স্থানীয় প্রশাসন ও পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, সদর, শিবগঞ্জ ও নাচোল উপজেলায় এসব দুর্ঘটনা ঘটে। নিহতদের মধ্যে চারজন আম কুড়াতে গিয়ে, একজন গরু আনতে গিয়ে এবং একজন ঘাস কেটে ফেরার পথে বজ্রপাতের শিকার হন।
নিহতরা হলেন-চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলার ঝিলিম ইউনিয়নের আতাহার এলাকার আব্দুল্লাহ, শিবগঞ্জ উপজেলার চকনরেন্দ্র গ্রামের মাহমুদা আক্তার, রানীবাড়ী-চাঁদপুর এলাকার সাদিয়া খাতুন, মোবারকপুর ইউনিয়নের শিকারপুর দক্ষিণপাড়ার মেসবাউল, নাচোল উপজেলার ফতেপুর লাহাবাড়ি গ্রামের সুমিয়ারা বেগম এবং নিজামপুর এলাকার হাসান আলী।
আমবাগানে একসঙ্গে ঝরে গেল তিন প্রাণ
শিবগঞ্জ উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় বিকেলে বৃষ্টির সময় আম কুড়াতে গিয়ে বজ্রপাতের শিকার হন মাহমুদা আক্তার, সাদিয়া খাতুন ও মেসবাউল। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, হঠাৎ করেই আকাশে বিকট শব্দে বজ্রপাত হয়। মুহূর্তেই মাটিতে লুটিয়ে পড়েন তারা। ঘটনাস্থলেই তাদের মৃত্যু হয়।
শিবগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মতিউর রহমান জানান, নিহতরা সবাই বাড়ির পাশের আমবাগানে আম সংগ্রহ করতে গিয়েছিলেন। বজ্রপাতের আঘাত এতটাই তীব্র ছিল যে তাদের বাঁচানোর কোনো সুযোগই পাওয়া যায়নি।
ঘটনার পর এলাকায় শোকের ছায়া নেমে আসে। স্বজনদের কান্নায় ভারী হয়ে ওঠে পরিবেশ।
গরু আনতে গিয়ে আর ফেরা হলো না আব্দুল্লাহর
সদর উপজেলার আতাহার এলাকায় বৃষ্টির মধ্যে মাঠ থেকে গরু আনতে গিয়েছিলেন আব্দুল্লাহ। পরিবারের সদস্যরা জানান, আবহাওয়া খারাপ দেখে তিনি দ্রুত গবাদিপশু নিয়ে বাড়ি ফেরার চেষ্টা করছিলেন।
কিন্তু হঠাৎ বজ্রপাত হলে তিনি গুরুতর আহত হন। স্থানীয়রা দ্রুত উদ্ধার করে চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা হাসপাতালে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
সদর মডেল থানার ওসি একরামুল হোসাইন বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
ঘাস কেটে বাড়ি ফেরার পথে প্রাণ হারালেন সুমিয়ারা
নাচোল উপজেলার ফতেপুর লাহাবাড়ি গ্রামের সুমিয়ারা বেগম দিনের কাজ শেষে মাঠ থেকে ঘাস কেটে বাড়ি ফিরছিলেন। বৃষ্টির মধ্যে পথ চলার সময় বজ্রপাতের শিকার হন তিনি।
স্থানীয়রা তাকে উদ্ধার করার চেষ্টা করলেও ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু হয়।
আম কুড়াতে গিয়ে প্রাণ গেল হাসান আলীরও
একই সময়ে নাচোল উপজেলার নিজামপুর এলাকায় আম কুড়াতে গিয়ে বজ্রপাতের শিকার হন হাসান আলী। স্থানীয়রা তাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নেওয়ার আগেই তার মৃত্যু হয়।
নাচোল থানার ওসি সুকোমল চন্দ্র দেবনাথ নিহতদের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
নিহত পরিবারগুলোকে আর্থিক সহায়তা
শিবগঞ্জ উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা মিজানুর রহমান জানান, বজ্রপাতে নিহত তিন পরিবারের প্রত্যেককে তাৎক্ষণিকভাবে ২৫ হাজার টাকা করে আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয়েছে। অন্য উপজেলার ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর জন্যও সরকারি সহায়তার প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশে প্রতি বছর বর্ষা ও কালবৈশাখী মৌসুমে বজ্রপাতে বহু মানুষের মৃত্যু হয়। কৃষিকাজ, আম কুড়ানো, মাছ ধরা কিংবা খোলা মাঠে অবস্থানের সময় সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকেন গ্রামীণ জনগোষ্ঠী।
আবহাওয়াবিদদের পরামর্শ অনুযায়ী, বজ্রপাত শুরু হলে খোলা মাঠ, আমবাগান, বড় গাছের নিচ, জলাশয়ের পাশ এবং উঁচু স্থানে অবস্থান না করাই নিরাপদ। বৃষ্টি ও বজ্রপাতের সময় দ্রুত কোনো পাকা ভবন বা নিরাপদ আশ্রয়ে চলে যাওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে।
চাঁপাইনবাবগঞ্জের এই মর্মান্তিক ঘটনায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে পুরো এলাকায়। কয়েক মিনিটের ব্যবধানে ছয়টি পরিবারের স্বপ্ন ও আনন্দ যেন বজ্রপাতের আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে গেছে।
নিজস্ব প্রতিবেদকঃ 

















