
একটি নবজাতককে ঘিরে পরিবারের স্বপ্নের শেষ থাকে না। কেউ আগেই নাম ঠিক করে রাখেন, কেউ নতুন জামাকাপড় কেনেন, কেউবা সন্তানের ভবিষ্যৎ নিয়ে রঙিন কল্পনায় ডুবে থাকেন। কিন্তু রাজধানীর আদ্-দ্বীন মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে সেই স্বপ্নগুলো মুহূর্তেই পরিণত হয়েছে শোকের পাহাড়ে। নাম রাখার আগেই নিভে গেছে কয়েকটি কোমল প্রাণ, আর সন্তানহারা পরিবারগুলোর বুকফাটা কান্নায় ভারী হয়ে উঠেছে হাসপাতালের পরিবেশ।
মঙ্গলবার গভীর রাতে হাসপাতালের পোস্ট-অপারেটিভ ওয়ার্ডে একের পর এক অসুস্থ হয়ে পড়ে কয়েকজন নবজাতক। পরবর্তীতে ছয় শিশুর মৃত্যুর ঘটনায় সৃষ্টি হয় চরম উদ্বেগ ও ক্ষোভ। বুধবার হাসপাতালে গিয়ে দেখা যায়, সন্তান হারানোর বেদনায় ভেঙে পড়েছেন স্বজনরা। কারও কোলে নিথর শিশুর দেহ, কারও চোখে অশ্রুর শেষ নেই।
প্রথম সন্তান, নামও রাখা হয়নি
মুন্সীগঞ্জের আরিফ ও মিম আক্তার দম্পতির সংসারে এসেছিল প্রথম সন্তান। মাত্র তিন দিনের কন্যাশিশুকে ঘিরে আনন্দে ভাসছিল পুরো পরিবার। কিন্তু সেই আনন্দ স্থায়ী হলো না।
শিশুটির দাদি মাসুদা বেগম নিথর দেহ কোলে নিয়ে কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, “নাতনির বয়স ছিল মাত্র তিন দিন। নামও রাখা হয়নি। সবাই কত খুশি ছিলাম। ভাবতেই পারছি না এভাবে চলে যাবে।”
তিনি জানান, সকালে ছেলে ফোন করে শিশুর অবস্থার অবনতির কথা জানালেও এমন মর্মান্তিক পরিণতির কথা কল্পনাও করেননি। পরিবারের অভিযোগ, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ তাদের স্পষ্ট কোনো ব্যাখ্যা দেয়নি।
ভিডিওকলে বাবার হাসি, কয়েক ঘণ্টা পর মৃত্যু সংবাদ
সৌদি আরব প্রবাসী সাইদুল ইসলামের কন্যাসন্তানের বয়সও ছিল মাত্র তিন দিন। মঙ্গলবার রাতেও ভিডিওকলে মেয়েকে দেখে আবেগাপ্লুত হয়েছিলেন তিনি। দূরদেশে থেকেও বারবার মেয়েকে আদর করছিলেন।
কিন্তু ভোরের দিকে হঠাৎ পরিস্থিতি বদলে যায়। শিশুটির স্বজনদের ভাষ্য, অন্য শিশুরা কান্না করলেও তাদের শিশুটি অস্বাভাবিকভাবে নিস্তব্ধ হয়ে পড়ে। পরে দেখা যায়, সে ঠিকমতো শ্বাস নিতে পারছে না।
পরিবারের সদস্যরা জানান, দ্রুত শিশুটিকে আইসিইউতে নেওয়া হলেও দীর্ঘ সময় তাদের ভেতরে ঢুকতে দেওয়া হয়নি। পরে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানায়, শিশুটি আর বেঁচে নেই।
পরিবারের সদস্যরা জানান, কেউ তাকে ‘বাবু’, কেউ ‘নাতিন’, আবার কেউ ‘বইন’ বলে ডাকত। কিন্তু আনুষ্ঠানিক নাম রাখার আগেই শেষ হয়ে যায় তার জীবনের গল্প।
যমজ দুই সন্তানের জন্য ছিল বাড়ি ফেরার প্রস্তুতি, ফিরল শুধু লাশ
রাজধানীর মাদারটেক এলাকার বাসিন্দা হাসান সরদার ও নাজমা বেগমের পরিবারে গত ২৪ মে জন্ম নেয় যমজ দুই ছেলে। চিকিৎসকদের কাছ থেকে বারবার আশ্বাস মিলছিল, শিশু দুটির অবস্থা ভালো। বুধবার তাদের বাড়ি নিয়ে যাওয়ারও প্রস্তুতি ছিল।
কিন্তু সেই প্রস্তুতি পরিণত হয় শোকযাত্রায়।
হাসান সরদারের অভিযোগ, গভীর রাতে ওয়ার্ডে হঠাৎ অস্বাভাবিক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। এরপর শিশুদের বমি শুরু হয় এবং একে একে তারা অসুস্থ হয়ে পড়ে।
তিনি বলেন, “আমরা শুনেছি রুমের ভেতরে গ্যাসের মতো কিছু ছিল। শুধু আমার বাচ্চা না, আরও কয়েকটি শিশু একইভাবে অসুস্থ হয়ে পড়ে।”
তার দাবি, অসুস্থ শিশুদের নিয়ে স্বজনদের এক তলা থেকে আরেক তলায় ছুটতে হয়েছে। প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও ওষুধ কেনার পরও শেষ পর্যন্ত আইসিইউতে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে যমজ দুই ভাই।
পরিবার জানিয়েছে, অন্য দুই সন্তানের নামের সঙ্গে মিল রেখে নবজাতক দুই শিশুরও নাম রাখার পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু সেই স্বপ্ন আর পূরণ হয়নি।
দুপুরে স্থানীয় কবরস্থানে পাশাপাশি দাফন করা হয় যমজ দুই শিশুকে।
শোক, প্রশ্ন আর অপেক্ষা
সন্তানদের দাফন শেষে ঘরে ফিরে বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েছেন মা নাজমা বেগম। আর বাবা হাসান সরদারের কণ্ঠে শুধু একটাই প্রশ্ন—“আজ তো ওদের বাসায় আনার কথা ছিল…”
নবজাতকদের মৃত্যুর ঘটনায় স্বজনদের মধ্যে ক্ষোভ, হতাশা ও নানা প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে। কী কারণে একসঙ্গে এতগুলো শিশু অসুস্থ হয়ে পড়ল, কোনো অব্যবস্থাপনা বা ত্রুটি ছিল কি না—এসব বিষয় নিয়ে তদন্তের দাবি উঠেছে।
এদিকে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ইতোমধ্যে ঘটনাটি তদন্তে পদক্ষেপ নিয়েছে বলে জানা গেছে। তবে তদন্তের ফলাফল না আসা পর্যন্ত স্বজনদের বুকের ভেতর জমে থাকা প্রশ্নগুলোর উত্তর মিলছে না।
যে শিশুদের জন্য পরিবার অপেক্ষা করছিল নতুন সূর্যের মতো, তাদের অনেকেই পৃথিবীর আলো দেখার কয়েক দিনের মধ্যেই চিরবিদায় নিয়েছে। নাম রাখার আগেই থেমে গেছে তাদের জীবন, আর পেছনে রেখে গেছে অসংখ্য অপূর্ণ স্বপ্ন ও সীমাহীন শোক।
দৈনিক অধিকার ডেস্ক 





















