ঢাকা ০৩:৩২ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ০৫ জুন ২০২৬, ২১ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
[gtranslate]
অর্থপাচারকারীদের ঋণ নয়

বন্ধ শিল্প পুনরুজ্জীবনে ২০ হাজার কোটি টাকার তহবিল

ফাইল ছবি।

দেশের বন্ধ ও উৎপাদন সংকটে থাকা শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোকে আবারও সচল করতে ২০ হাজার কোটি টাকার একটি বিশেষ প্রাক-অর্থায়ন তহবিল গঠন করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এ তহবিলের মাধ্যমে শিল্প উৎপাদন বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, রপ্তানি সম্প্রসারণ এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে গতি ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

বৃহস্পতিবার এ সংক্রান্ত একটি সার্কুলার জারি করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এতে বলা হয়েছে, ঋণ খেলাপি, অর্থপাচার, জালিয়াতি, ঋণ তছরুপ কিংবা ঋণের অর্থ অপব্যবহারের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান এ সুবিধা পাবে না। একই সঙ্গে ঋণের অর্থের অপব্যবহার হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনগত ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা অনুযায়ী, তফসিলি ব্যাংকগুলোর উদ্বৃত্ত তারল্য ব্যবহার করে তিন বছর মেয়াদি এই তহবিল পরিচালিত হবে। দেশের সব তফসিলি ব্যাংক এতে অংশ নিতে পারবে। তবে অংশগ্রহণের জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সঙ্গে পৃথক চুক্তি স্বাক্ষর করতে হবে।

এই স্কিমের আওতায় বৃহৎ শিল্প ও সেবা খাতের এমন প্রতিষ্ঠান ঋণ সুবিধা পাবে, যেগুলো সম্পূর্ণ বা আংশিকভাবে বন্ধ রয়েছে কিংবা কার্যকর মূলধনের অভাবে পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন ও সেবা কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারছে না।

বিশেষভাবে রপ্তানিমুখী এবং উচ্চ রপ্তানি সম্ভাবনাময় প্রতিষ্ঠানগুলোকে অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। এছাড়া অধিগ্রহণ (টেকওভার) বা ভাড়া চুক্তির মাধ্যমে কোনো উদ্যোক্তা বন্ধ শিল্পপ্রতিষ্ঠান চালু করতে চাইলে তাকেও গুরুত্ব দেওয়ার নির্দেশনা রয়েছে।

তবে ঋণ অনুমোদনের আগে সংশ্লিষ্ট ব্যাংককে প্রতিষ্ঠানের প্রকৃত অবস্থা, উৎপাদন সক্ষমতা, মূলধনের প্রয়োজনীয়তা এবং ঋণ পরিশোধের সামর্থ্য যাচাই করতে হবে। কেবল ব্যবস্থাপনা ব্যর্থতা, প্রযুক্তিগত দুর্বলতা বা বিপণন সমস্যার কারণে ক্ষতিগ্রস্ত প্রতিষ্ঠানের জন্য এ তহবিল ব্যবহার করা যাবে না।

ঋণ পাওয়ার ক্ষেত্রে শিল্প বা সেবা প্রতিষ্ঠানের উৎপাদন সক্ষমতার প্রমাণ হিসেবে এফবিসিসিআই, বিজিএমইএ, বিকেএমইএসহ সংশ্লিষ্ট বাণিজ্য সংগঠনের প্রত্যয়নপত্র জমা দিতে হবে। তবে প্রয়োজনবোধে ব্যাংক নিজস্ব তদন্তের ভিত্তিতেও ঋণ অনুমোদন করতে পারবে।

বাংলাদেশ ব্যাংক স্পষ্টভাবে জানিয়েছে, ঋণ খেলাপি হিসেবে চিহ্নিত ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান, অর্থপাচারকারী, জালিয়াতি ও ঋণ তছরুপের সঙ্গে জড়িতরা এ তহবিল থেকে কোনো সুবিধা নিতে পারবে না।

স্কিমের অর্থ শ্রমিক-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা, বিদ্যুৎ-গ্যাস ও অন্যান্য ইউটিলিটি বিল, কাঁচামাল সংগ্রহ, রপ্তানি আদেশ বাস্তবায়ন এবং উৎপাদন ব্যয়ে ব্যবহার করা যাবে।

তবে এ অর্থ কোনোভাবেই বিদ্যমান ঋণ পরিশোধ বা সমন্বয়ের কাজে ব্যবহার করা যাবে না।

শ্রমিকদের বেতন-ভাতা প্রদানের ক্ষেত্রে নগদ লেনদেন নিষিদ্ধ করা হয়েছে। ব্যাংক হিসাব অথবা মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস) এর মাধ্যমে সরাসরি অর্থ পরিশোধ করতে হবে। এ জন্য শ্রমিকদের জাতীয় পরিচয়পত্র যাচাই বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। বেতন-ভাতা বাবদ সর্বোচ্চ চার মাসের সমপরিমাণ অর্থ ব্যয় করা যাবে।

সার্কুলারে বলা হয়েছে, কোনো একক প্রতিষ্ঠান বা গ্রুপকে সর্বোচ্চ ২০০ কোটি টাকা পর্যন্ত ঋণ দেওয়া যাবে। প্রতিটি ঋণের মেয়াদ হবে এক বছর। তবে গ্রাহকের সন্তোষজনক লেনদেন এবং তহবিলের প্রাপ্যতা বিবেচনায় ঋণ নবায়নের সুযোগ থাকবে।

এই স্কিমের আওতায় ব্যাংকগুলো বাংলাদেশ ব্যাংককে ৪ শতাংশ হারে সুদ পরিশোধ করবে। অন্যদিকে গ্রাহক পর্যায়ে ঋণের সর্বোচ্চ সুদের হার নির্ধারণ করা হয়েছে ৭ শতাংশ।

ঋণ গ্রহণের পর প্রথম ছয় মাস সুদ পরিশোধে ছাড় থাকবে। এরপর নিয়মিত সুদ পরিশোধ কার্যক্রম শুরু হবে।

ঋণের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করতে ব্যাংকগুলোকে প্রতি সপ্তাহে সুবিধাভোগী প্রতিষ্ঠানের অগ্রগতি প্রতিবেদন সংগ্রহ করতে হবে। এছাড়া প্রতি তিন মাসে কারখানা পরিদর্শন করে পৃথক প্রতিবেদন প্রস্তুত করতে হবে।

বাংলাদেশ ব্যাংকও প্রয়োজন অনুযায়ী সরেজমিনে পরিদর্শন করতে পারবে। ঋণের অপব্যবহার প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের চলতি হিসাব থেকে অতিরিক্ত ২ শতাংশ সুদসহ অর্থ সমন্বয় করা হবে।

এছাড়া মিথ্যা তথ্য প্রদান, জালিয়াতি, অনিয়ম বা ঋণ খেলাপির ঘটনা ঘটলে সংশ্লিষ্ট ঋণগ্রহীতার তথ্য সরকারি সংস্থার কাছে পাঠানো হবে এবং প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

নীতিমালায় আরও বলা হয়েছে, কোনো ব্যাংক কর্মকর্তা বা কর্মচারীর বিরুদ্ধে ঋণ অনিয়ম, জালিয়াতি বা অপব্যবহারে সম্পৃক্ততার প্রমাণ পাওয়া গেলে তাদের বিরুদ্ধেও প্রশাসনিক ও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের এই নতুন উদ্যোগকে শিল্প খাত পুনরুজ্জীবন, কর্মসংস্থান বৃদ্ধি এবং অর্থনীতিতে নতুন গতি সৃষ্টির লক্ষ্যে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

জনপ্রিয় সংবাদ

অর্থপাচারকারীদের ঋণ নয়

বন্ধ শিল্প পুনরুজ্জীবনে ২০ হাজার কোটি টাকার তহবিল

প্রকাশের সময়ঃ ০১:২৮:৫২ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ৫ জুন ২০২৬

দেশের বন্ধ ও উৎপাদন সংকটে থাকা শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোকে আবারও সচল করতে ২০ হাজার কোটি টাকার একটি বিশেষ প্রাক-অর্থায়ন তহবিল গঠন করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এ তহবিলের মাধ্যমে শিল্প উৎপাদন বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, রপ্তানি সম্প্রসারণ এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে গতি ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

বৃহস্পতিবার এ সংক্রান্ত একটি সার্কুলার জারি করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এতে বলা হয়েছে, ঋণ খেলাপি, অর্থপাচার, জালিয়াতি, ঋণ তছরুপ কিংবা ঋণের অর্থ অপব্যবহারের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান এ সুবিধা পাবে না। একই সঙ্গে ঋণের অর্থের অপব্যবহার হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনগত ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা অনুযায়ী, তফসিলি ব্যাংকগুলোর উদ্বৃত্ত তারল্য ব্যবহার করে তিন বছর মেয়াদি এই তহবিল পরিচালিত হবে। দেশের সব তফসিলি ব্যাংক এতে অংশ নিতে পারবে। তবে অংশগ্রহণের জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সঙ্গে পৃথক চুক্তি স্বাক্ষর করতে হবে।

এই স্কিমের আওতায় বৃহৎ শিল্প ও সেবা খাতের এমন প্রতিষ্ঠান ঋণ সুবিধা পাবে, যেগুলো সম্পূর্ণ বা আংশিকভাবে বন্ধ রয়েছে কিংবা কার্যকর মূলধনের অভাবে পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন ও সেবা কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারছে না।

বিশেষভাবে রপ্তানিমুখী এবং উচ্চ রপ্তানি সম্ভাবনাময় প্রতিষ্ঠানগুলোকে অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। এছাড়া অধিগ্রহণ (টেকওভার) বা ভাড়া চুক্তির মাধ্যমে কোনো উদ্যোক্তা বন্ধ শিল্পপ্রতিষ্ঠান চালু করতে চাইলে তাকেও গুরুত্ব দেওয়ার নির্দেশনা রয়েছে।

তবে ঋণ অনুমোদনের আগে সংশ্লিষ্ট ব্যাংককে প্রতিষ্ঠানের প্রকৃত অবস্থা, উৎপাদন সক্ষমতা, মূলধনের প্রয়োজনীয়তা এবং ঋণ পরিশোধের সামর্থ্য যাচাই করতে হবে। কেবল ব্যবস্থাপনা ব্যর্থতা, প্রযুক্তিগত দুর্বলতা বা বিপণন সমস্যার কারণে ক্ষতিগ্রস্ত প্রতিষ্ঠানের জন্য এ তহবিল ব্যবহার করা যাবে না।

ঋণ পাওয়ার ক্ষেত্রে শিল্প বা সেবা প্রতিষ্ঠানের উৎপাদন সক্ষমতার প্রমাণ হিসেবে এফবিসিসিআই, বিজিএমইএ, বিকেএমইএসহ সংশ্লিষ্ট বাণিজ্য সংগঠনের প্রত্যয়নপত্র জমা দিতে হবে। তবে প্রয়োজনবোধে ব্যাংক নিজস্ব তদন্তের ভিত্তিতেও ঋণ অনুমোদন করতে পারবে।

বাংলাদেশ ব্যাংক স্পষ্টভাবে জানিয়েছে, ঋণ খেলাপি হিসেবে চিহ্নিত ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান, অর্থপাচারকারী, জালিয়াতি ও ঋণ তছরুপের সঙ্গে জড়িতরা এ তহবিল থেকে কোনো সুবিধা নিতে পারবে না।

স্কিমের অর্থ শ্রমিক-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা, বিদ্যুৎ-গ্যাস ও অন্যান্য ইউটিলিটি বিল, কাঁচামাল সংগ্রহ, রপ্তানি আদেশ বাস্তবায়ন এবং উৎপাদন ব্যয়ে ব্যবহার করা যাবে।

তবে এ অর্থ কোনোভাবেই বিদ্যমান ঋণ পরিশোধ বা সমন্বয়ের কাজে ব্যবহার করা যাবে না।

শ্রমিকদের বেতন-ভাতা প্রদানের ক্ষেত্রে নগদ লেনদেন নিষিদ্ধ করা হয়েছে। ব্যাংক হিসাব অথবা মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস) এর মাধ্যমে সরাসরি অর্থ পরিশোধ করতে হবে। এ জন্য শ্রমিকদের জাতীয় পরিচয়পত্র যাচাই বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। বেতন-ভাতা বাবদ সর্বোচ্চ চার মাসের সমপরিমাণ অর্থ ব্যয় করা যাবে।

সার্কুলারে বলা হয়েছে, কোনো একক প্রতিষ্ঠান বা গ্রুপকে সর্বোচ্চ ২০০ কোটি টাকা পর্যন্ত ঋণ দেওয়া যাবে। প্রতিটি ঋণের মেয়াদ হবে এক বছর। তবে গ্রাহকের সন্তোষজনক লেনদেন এবং তহবিলের প্রাপ্যতা বিবেচনায় ঋণ নবায়নের সুযোগ থাকবে।

এই স্কিমের আওতায় ব্যাংকগুলো বাংলাদেশ ব্যাংককে ৪ শতাংশ হারে সুদ পরিশোধ করবে। অন্যদিকে গ্রাহক পর্যায়ে ঋণের সর্বোচ্চ সুদের হার নির্ধারণ করা হয়েছে ৭ শতাংশ।

ঋণ গ্রহণের পর প্রথম ছয় মাস সুদ পরিশোধে ছাড় থাকবে। এরপর নিয়মিত সুদ পরিশোধ কার্যক্রম শুরু হবে।

ঋণের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করতে ব্যাংকগুলোকে প্রতি সপ্তাহে সুবিধাভোগী প্রতিষ্ঠানের অগ্রগতি প্রতিবেদন সংগ্রহ করতে হবে। এছাড়া প্রতি তিন মাসে কারখানা পরিদর্শন করে পৃথক প্রতিবেদন প্রস্তুত করতে হবে।

বাংলাদেশ ব্যাংকও প্রয়োজন অনুযায়ী সরেজমিনে পরিদর্শন করতে পারবে। ঋণের অপব্যবহার প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের চলতি হিসাব থেকে অতিরিক্ত ২ শতাংশ সুদসহ অর্থ সমন্বয় করা হবে।

এছাড়া মিথ্যা তথ্য প্রদান, জালিয়াতি, অনিয়ম বা ঋণ খেলাপির ঘটনা ঘটলে সংশ্লিষ্ট ঋণগ্রহীতার তথ্য সরকারি সংস্থার কাছে পাঠানো হবে এবং প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

নীতিমালায় আরও বলা হয়েছে, কোনো ব্যাংক কর্মকর্তা বা কর্মচারীর বিরুদ্ধে ঋণ অনিয়ম, জালিয়াতি বা অপব্যবহারে সম্পৃক্ততার প্রমাণ পাওয়া গেলে তাদের বিরুদ্ধেও প্রশাসনিক ও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের এই নতুন উদ্যোগকে শিল্প খাত পুনরুজ্জীবন, কর্মসংস্থান বৃদ্ধি এবং অর্থনীতিতে নতুন গতি সৃষ্টির লক্ষ্যে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।