ঢাকা ০৩:৩৪ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ০৫ জুন ২০২৬, ২১ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
[gtranslate]

স্বেচ্ছাসেবক দল নেতাকে পিটুনির অভিযোগে ওসিসহ ৫ পুলিশ প্রত্যাহার

সংগৃহীত ছবি।

রংপুর মহানগরীর কোতোয়ালি থানার ভেতরে স্বেচ্ছাসেবক দলের এক নেতাকে মারধরের অভিযোগকে কেন্দ্র করে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। ঘটনার পর পুলিশের বিরুদ্ধে নির্যাতনের অভিযোগ তুলে বিক্ষোভে ফেটে পড়েন বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীরা। পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠলে শেষ পর্যন্ত কোতোয়ালি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আজাদ রহমানসহ পাঁচ পুলিশ সদস্যকে প্রত্যাহার করেছে রংপুর মহানগর পুলিশ (আরএমপি)। একই সঙ্গে ঘটনা তদন্তে তিন সদস্যের একটি কমিটিও গঠন করা হয়েছে।

অভিযোগের শিকার রাকিবুল ইসলাম রংপুর সদর উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের সদস্যসচিব। তিনি দাবি করেছেন, বুধবার রাতে থানার ভেতরে ওসি আজাদ রহমানের উপস্থিতিতে কয়েকজন পুলিশ সদস্য তাকে বেধড়ক মারধর করেন। এতে তিনি গুরুতর আহত হন এবং মাথা ও চোখে রক্তাক্ত জখম নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হতে হয়।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ঈদুল আজহার আগে নগরীর সিও বাজার এলাকায় এক প্রেমিক যুগল নিখোঁজ হওয়ার ঘটনায় পরিবারের পক্ষ থেকে কোতোয়ালি থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করা হয়েছিল। পরে ওই যুগলকে উদ্ধার করে বুধবার থানায় আনা হয়।

দুই পরিবারের অনুরোধে বিষয়টি পারিবারিকভাবে মীমাংসার উদ্যোগ নেওয়া হয়। এ লক্ষ্যে স্বেচ্ছাসেবক দলের কয়েকজন নেতা থানায় যান। তাদের সঙ্গে ছিলেন রাকিবুল ইসলামও।

রাকিবুল ইসলামের ভাষ্য অনুযায়ী, রাত সাড়ে ৯টার দিকে থানায় পৌঁছে তিনি দেখতে পান, এক পুলিশ সদস্য ওই যুগলকে মারধর করছেন। তিনি এর প্রতিবাদ করলে পুলিশ সদস্যদের সঙ্গে তার কথা কাটাকাটি হয়। একপর্যায়ে ওসি আজাদ রহমানের নেতৃত্বে কয়েকজন পুলিশ সদস্য তার ওপর হামলে পড়ে মারধর শুরু করেন।

হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় রাকিবুল ইসলাম সাংবাদিকদের বলেন, তিনি নিজের রাজনৈতিক পরিচয় দেওয়ার পরও তাকে রেহাই দেওয়া হয়নি। বরং আরও বেশি আক্রমণাত্মক আচরণ করা হয়।

তার দাবি, মাথা, মুখ ও চোখে আঘাত করা হয়। এমনকি রাইফেলের বাট ও অন্যান্য সরঞ্জাম দিয়েও তাকে আঘাত করা হয়েছে। এ সময় তার কাছে থাকা দুটি মোবাইল ফোনও নিয়ে নেওয়া হয় বলে অভিযোগ করেন তিনি।

রাকিবুল আরও বলেন, মারধরের পর তার শরীরে লেগে থাকা রক্ত জোরপূর্বক ধুয়ে ফেলতে বাধ্য করা হয়, যাতে ঘটনার আলামত নষ্ট হয়ে যায়।

ঘটনার খবর ছড়িয়ে পড়তেই রাতেই কোতোয়ালি থানার সামনে বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীরা জড়ো হতে থাকেন। একপর্যায়ে থানা এলাকায় উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে থানার কলাপসিবল গেট বন্ধ করে দেয় পুলিশ। এ সময় গেটের ভেতর থেকেই সাংবাদিকদের কাছে নিজের ওপর নির্যাতনের অভিযোগ তুলে ধরেন রাকিবুল।

নেতাকর্মীরা অভিযুক্ত পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়ে বিক্ষোভ করতে থাকেন। তাদের অভিযোগ, রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে রাকিবুলকে লক্ষ্যবস্তু বানানো হয়েছে। ঘটনার পর রংপুর মহানগর পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ আবদুল মাবুদ স্বাক্ষরিত এক আদেশে কোতোয়ালি থানার ওসি আজাদ রহমানসহ পাঁচ পুলিশ সদস্যকে প্রত্যাহার করা হয়।

প্রত্যাহার হওয়া অন্য সদস্যরা হলেন—উপপরিদর্শক (এসআই) মাসুদ রানা, সহকারী উপপরিদর্শক (এএসআই) মোছা. মেহেরুন নেসা এবং কনস্টেবল লিমা সরেন ও বাসুদেব রায়। তাদের সবাইকে রংপুর পুলিশ লাইন্সে সংযুক্ত করা হয়েছে বলে জানিয়েছে মহানগর পুলিশ।

ঘটনার সত্যতা যাচাইয়ে অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (প্রশাসন ও অর্থ) নরেশ চাকমার নেতৃত্বে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।

রংপুর মহানগর পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, অভিযোগের বিষয়ে নিরপেক্ষ তদন্ত করা হবে। তদন্ত প্রতিবেদনের ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

তবে নিজের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ পুরোপুরি অস্বীকার করেছেন প্রত্যাহার হওয়া ওসি আজাদ রহমান।

তিনি বলেন, ঘটনার সময় থানার বাইরে হট্টগোল ও ধস্তাধস্তির পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছিল। রাকিবুল ইসলাম অন্য কারও হাতে আহত হয়ে থাকতে পারেন। তার ওপর পুলিশের কোনো নির্যাতন হয়নি এবং এ ঘটনায় তিনি ব্যক্তিগতভাবে জড়িত নন বলেও দাবি করেন।

প্রথমে ওসিকে বাদ দিয়ে কয়েকজন পুলিশ সদস্যকে প্রত্যাহারের সিদ্ধান্তে বিএনপি নেতাকর্মীদের মধ্যে ক্ষোভ দেখা দেয়।

জেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের সদস্যসচিব জাকারিয়া ইসলাম বলেন, তাদের কর্মীকে নির্যাতনের ঘটনায় ওসির সরাসরি ভূমিকা রয়েছে বলে তারা বিশ্বাস করেন। তাই শুধু প্রত্যাহার নয়, অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ও আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান তিনি।

রংপুর মহানগর পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ আবদুল মাবুদ বলেছেন, কোনো অভিযোগকেই হালকাভাবে দেখা হচ্ছে না। তদন্তে যদি অভিযোগের সত্যতা পাওয়া যায়, তাহলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কঠোর প্রশাসনিক ও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

রংপুরের এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক অঙ্গন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে। তদন্ত প্রতিবেদনের দিকে এখন সবার নজর।

জনপ্রিয় সংবাদ

স্বেচ্ছাসেবক দল নেতাকে পিটুনির অভিযোগে ওসিসহ ৫ পুলিশ প্রত্যাহার

প্রকাশের সময়ঃ ০১:৫৭:১৩ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ৫ জুন ২০২৬

রংপুর মহানগরীর কোতোয়ালি থানার ভেতরে স্বেচ্ছাসেবক দলের এক নেতাকে মারধরের অভিযোগকে কেন্দ্র করে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। ঘটনার পর পুলিশের বিরুদ্ধে নির্যাতনের অভিযোগ তুলে বিক্ষোভে ফেটে পড়েন বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীরা। পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠলে শেষ পর্যন্ত কোতোয়ালি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আজাদ রহমানসহ পাঁচ পুলিশ সদস্যকে প্রত্যাহার করেছে রংপুর মহানগর পুলিশ (আরএমপি)। একই সঙ্গে ঘটনা তদন্তে তিন সদস্যের একটি কমিটিও গঠন করা হয়েছে।

অভিযোগের শিকার রাকিবুল ইসলাম রংপুর সদর উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের সদস্যসচিব। তিনি দাবি করেছেন, বুধবার রাতে থানার ভেতরে ওসি আজাদ রহমানের উপস্থিতিতে কয়েকজন পুলিশ সদস্য তাকে বেধড়ক মারধর করেন। এতে তিনি গুরুতর আহত হন এবং মাথা ও চোখে রক্তাক্ত জখম নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হতে হয়।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ঈদুল আজহার আগে নগরীর সিও বাজার এলাকায় এক প্রেমিক যুগল নিখোঁজ হওয়ার ঘটনায় পরিবারের পক্ষ থেকে কোতোয়ালি থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করা হয়েছিল। পরে ওই যুগলকে উদ্ধার করে বুধবার থানায় আনা হয়।

দুই পরিবারের অনুরোধে বিষয়টি পারিবারিকভাবে মীমাংসার উদ্যোগ নেওয়া হয়। এ লক্ষ্যে স্বেচ্ছাসেবক দলের কয়েকজন নেতা থানায় যান। তাদের সঙ্গে ছিলেন রাকিবুল ইসলামও।

রাকিবুল ইসলামের ভাষ্য অনুযায়ী, রাত সাড়ে ৯টার দিকে থানায় পৌঁছে তিনি দেখতে পান, এক পুলিশ সদস্য ওই যুগলকে মারধর করছেন। তিনি এর প্রতিবাদ করলে পুলিশ সদস্যদের সঙ্গে তার কথা কাটাকাটি হয়। একপর্যায়ে ওসি আজাদ রহমানের নেতৃত্বে কয়েকজন পুলিশ সদস্য তার ওপর হামলে পড়ে মারধর শুরু করেন।

হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় রাকিবুল ইসলাম সাংবাদিকদের বলেন, তিনি নিজের রাজনৈতিক পরিচয় দেওয়ার পরও তাকে রেহাই দেওয়া হয়নি। বরং আরও বেশি আক্রমণাত্মক আচরণ করা হয়।

তার দাবি, মাথা, মুখ ও চোখে আঘাত করা হয়। এমনকি রাইফেলের বাট ও অন্যান্য সরঞ্জাম দিয়েও তাকে আঘাত করা হয়েছে। এ সময় তার কাছে থাকা দুটি মোবাইল ফোনও নিয়ে নেওয়া হয় বলে অভিযোগ করেন তিনি।

রাকিবুল আরও বলেন, মারধরের পর তার শরীরে লেগে থাকা রক্ত জোরপূর্বক ধুয়ে ফেলতে বাধ্য করা হয়, যাতে ঘটনার আলামত নষ্ট হয়ে যায়।

ঘটনার খবর ছড়িয়ে পড়তেই রাতেই কোতোয়ালি থানার সামনে বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীরা জড়ো হতে থাকেন। একপর্যায়ে থানা এলাকায় উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে থানার কলাপসিবল গেট বন্ধ করে দেয় পুলিশ। এ সময় গেটের ভেতর থেকেই সাংবাদিকদের কাছে নিজের ওপর নির্যাতনের অভিযোগ তুলে ধরেন রাকিবুল।

নেতাকর্মীরা অভিযুক্ত পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়ে বিক্ষোভ করতে থাকেন। তাদের অভিযোগ, রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে রাকিবুলকে লক্ষ্যবস্তু বানানো হয়েছে। ঘটনার পর রংপুর মহানগর পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ আবদুল মাবুদ স্বাক্ষরিত এক আদেশে কোতোয়ালি থানার ওসি আজাদ রহমানসহ পাঁচ পুলিশ সদস্যকে প্রত্যাহার করা হয়।

প্রত্যাহার হওয়া অন্য সদস্যরা হলেন—উপপরিদর্শক (এসআই) মাসুদ রানা, সহকারী উপপরিদর্শক (এএসআই) মোছা. মেহেরুন নেসা এবং কনস্টেবল লিমা সরেন ও বাসুদেব রায়। তাদের সবাইকে রংপুর পুলিশ লাইন্সে সংযুক্ত করা হয়েছে বলে জানিয়েছে মহানগর পুলিশ।

ঘটনার সত্যতা যাচাইয়ে অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (প্রশাসন ও অর্থ) নরেশ চাকমার নেতৃত্বে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।

রংপুর মহানগর পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, অভিযোগের বিষয়ে নিরপেক্ষ তদন্ত করা হবে। তদন্ত প্রতিবেদনের ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

তবে নিজের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ পুরোপুরি অস্বীকার করেছেন প্রত্যাহার হওয়া ওসি আজাদ রহমান।

তিনি বলেন, ঘটনার সময় থানার বাইরে হট্টগোল ও ধস্তাধস্তির পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছিল। রাকিবুল ইসলাম অন্য কারও হাতে আহত হয়ে থাকতে পারেন। তার ওপর পুলিশের কোনো নির্যাতন হয়নি এবং এ ঘটনায় তিনি ব্যক্তিগতভাবে জড়িত নন বলেও দাবি করেন।

প্রথমে ওসিকে বাদ দিয়ে কয়েকজন পুলিশ সদস্যকে প্রত্যাহারের সিদ্ধান্তে বিএনপি নেতাকর্মীদের মধ্যে ক্ষোভ দেখা দেয়।

জেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের সদস্যসচিব জাকারিয়া ইসলাম বলেন, তাদের কর্মীকে নির্যাতনের ঘটনায় ওসির সরাসরি ভূমিকা রয়েছে বলে তারা বিশ্বাস করেন। তাই শুধু প্রত্যাহার নয়, অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ও আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান তিনি।

রংপুর মহানগর পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ আবদুল মাবুদ বলেছেন, কোনো অভিযোগকেই হালকাভাবে দেখা হচ্ছে না। তদন্তে যদি অভিযোগের সত্যতা পাওয়া যায়, তাহলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কঠোর প্রশাসনিক ও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

রংপুরের এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক অঙ্গন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে। তদন্ত প্রতিবেদনের দিকে এখন সবার নজর।