
রাজধানীর এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্ত—সরকারি ও বেসরকারি মিলিয়ে আটটি হাসপাতালের দরজায় কড়া নাড়লেও মেলেনি জরুরি চিকিৎসা। অসহায়, পরিচয়হীন ও মানসিক ভারসাম্যহীন এক নারীকে নিয়ে দিনের পর দিন ঘুরেছেন এক যুবক। অবশেষে সামাজিক সচেতনতা, গণমাধ্যমের নজর এবং মানবিক চাপের মুখে চিকিৎসার সুযোগ পেলেন সেই নারী। বর্তমানে শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছেন দুলালী (৪০)।
চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, দুলালী গুরুতর অ্যানিমিয়া (তীব্র রক্তস্বল্পতা), শরীরে লবণ ও খনিজের ভারসাম্যহীনতা এবং প্রাণঘাতী সেপটিক শকে আক্রান্ত। তার শারীরিক অবস্থা এখনও আশঙ্কাজনক হলেও নিবিড় পর্যবেক্ষণে রেখে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।
এক অসহায় নারীর জন্য এক যুবকের ব্যতিক্রমী সংগ্রাম
দুলালীর চিকিৎসা নিশ্চিত করতে যিনি সবচেয়ে বেশি চেষ্টা করেছেন, তিনি মুছা করিম রিপন নামে এক যুবক। গত ২২ মে সকালে নিজের বাসার পাশের একটি গলিতে অসুস্থ অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখেন দুলালীকে। তিনি কোনো সুস্পষ্ট পরিচয় দিতে পারছিলেন না, কথাবার্তাও ছিল অসংলগ্ন।
মানবিক দায়িত্ববোধ থেকে রিপন তাকে চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে নিতে শুরু করেন। কিন্তু শুরু হয় এক অবিশ্বাস্য ভোগান্তি।
প্রথমে তাকে নেওয়া হয় শ্যামলীর জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটে। সেখান থেকে পাঠানো হয় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। এরপর ফার্মগেটের মডার্ন সাইকিয়াট্রিক হাসপাতাল, এক্সিম ব্যাংক হাসপাতাল, মোহাম্মদপুরের নিরাময় ক্লিনিক, ধানমন্ডির সুপারম্যাক্স হাসপাতালসহ একের পর এক প্রতিষ্ঠানে নিয়ে গেলেও কোথাও ভর্তি করা হয়নি।
কখনও বেড সংকট, কখনও রোগীর জটিল অবস্থা, আবার কখনও প্রশাসনিক কারণ দেখিয়ে ফিরিয়ে দেওয়া হয় তাকে।
প্রশ্নের মুখে স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা
একজন গুরুতর অসুস্থ নারী, যিনি নিজে নিজের পরিচয় পর্যন্ত দিতে পারছেন না, তাকে চিকিৎসা দিতে দেশের নামকরা হাসপাতালগুলোর অনীহা নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে জরুরি স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার মানবিকতা ও জবাবদিহিতা নিয়ে।
স্বাস্থ্য অধিকারকর্মীরা বলছেন, কোনো রোগীকে চিকিৎসা না দিয়ে হাসপাতাল থেকে হাসপাতালে ঘুরতে বাধ্য করা শুধু অমানবিকই নয়, এটি চিকিৎসাসেবা নীতিমালারও পরিপন্থী।
বিশেষজ্ঞদের মতে, জরুরি অবস্থায় রোগীকে প্রাথমিক চিকিৎসা ও স্থিতিশীল করার দায়িত্ব থেকে কোনো হাসপাতাল সহজে সরে যেতে পারে না। দুলালীর ঘটনা স্বাস্থ্য খাতের এক উদ্বেগজনক বাস্তবতা সামনে এনেছে।
‘দুলালিকে বাঁচাতে চাই’ প্ল্যাকার্ড নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনের সামনে
সব চেষ্টা ব্যর্থ হওয়ার পরও হাল ছাড়েননি মুছা করিম রিপন। অসহায় নারীর চিকিৎসা নিশ্চিত করতে তিনি গুলশানে প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসভবনের সামনে গিয়ে ‘দুলালিকে বাঁচাতে চাই’ লেখা প্ল্যাকার্ড হাতে দাঁড়ান।
তার এই মানবিক আবেদন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে বিষয়টি জনমনে আলোচনার জন্ম দেয়। পরে সংশ্লিষ্ট মহলের নজরে আসে দুলালীর ঘটনা এবং দ্রুত চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হয়।
অনেকেই রিপনের এই উদ্যোগকে মানবতার অনন্য দৃষ্টান্ত হিসেবে অভিহিত করেছেন।
আইসিইউতে চিকিৎসাধীন, নজরদারিতে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর
শনিবার দুপুরে দুলালীর চিকিৎসার অগ্রগতি দেখতে শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে যান স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাস।
তিনি চিকিৎসকদের সঙ্গে কথা বলেন এবং রোগীর সর্বোচ্চ চিকিৎসা নিশ্চিত করার নির্দেশনা দেন। এ সময় হাসপাতালের সংশ্লিষ্ট চিকিৎসক ও কর্মকর্তারাও উপস্থিত ছিলেন।
চিকিৎসকরা জানান, দুলালী দীর্ঘদিন ধরে মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যায় ভুগছেন। তার শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটেছে দীর্ঘদিনের অবহেলা, অপুষ্টি এবং চিকিৎসার অভাবে।
সরকারি তত্ত্বাবধানে চিকিৎসার আশ্বাস
প্রধানমন্ত্রীর স্বাস্থ্যবিষয়ক বিশেষ সহকারী (প্রতিমন্ত্রী পদমর্যাদা) এস এম জিয়াউদ্দিন হায়দার জানিয়েছেন, দুলালীর চিকিৎসার সার্বিক তত্ত্বাবধান সরকারিভাবে করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, রোগীর প্রয়োজনীয় চিকিৎসা, ওষুধ এবং অন্যান্য সহযোগিতা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্টদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। চিকিৎসার কোনো ঘাটতি রাখা হবে না।
দুলালীর ঘটনা কি বদলাবে ব্যবস্থার চিত্র?
দুলালী এখন আইসিইউতে। জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে তিনি চিকিৎসা পাচ্ছেন ঠিকই, কিন্তু প্রশ্ন রয়ে গেছে—একজন অসহায় নারীকে কেন চিকিৎসার জন্য আটটি হাসপাতালের দ্বারে দ্বারে ঘুরতে হলো?
এই ঘটনা শুধু একজন দুলালীর নয়; এটি দেশের স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার মানবিক সংকট, সমন্বয়হীনতা এবং জরুরি চিকিৎসা ব্যবস্থার দুর্বলতার প্রতিচ্ছবি বলেও মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
অনেকের মতে, মুছা করিম রিপনের মতো একজন সাধারণ নাগরিক যদি মানবিক দায়িত্ববোধ থেকে এতটা লড়াই করতে পারেন, তবে রাষ্ট্রীয় ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো কেন শুরু থেকেই একজন অসহায় রোগীর পাশে দাঁড়াতে পারল না—সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই হবে।
দুলালীর বেঁচে থাকার লড়াই এখন শুধু একটি চিকিৎসা-সংবাদ নয়; এটি মানবতা, দায়িত্ববোধ এবং স্বাস্থ্যসেবার জবাবদিহিতার এক গভীর প্রতিচ্ছবি।
দৈনিক অধিকার ডেস্ক 






















